শিরোনাম

নদী-সুন্দরবন আর নিষেধাজ্ঞার ফাঁকে সাতক্ষীরার জেলেদের জীবন

নদী-সুন্দরবন আর নিষেধাজ্ঞার ফাঁকে সাতক্ষীরার জেলেদের জীবন

ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙে তাদের। কেউ নৌকার দড়ি পরীক্ষা করেন, কেউ জাল গুছিয়ে নেন, কেউ আবার নৌকায় খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তুলে নেন। এরপর নদীর স্রোত আর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে সুন্দরবনের দিকে যাত্রা। মাছ বা কাঁকড়া মিললে সেদিনের সংসারে কিছুটা স্বস্তি; না মিললে ঋণ আর ধার করে পরের দিনের প্রস্তুতি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনের সঙ্গে এভাবেই জড়িয়ে আছে নদী ও সুন্দরবন। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদনির্ভর এই জীবন একদিকে যেমন জীবিকার অবলম্বন, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকি, নিষেধাজ্ঞা, জলদস্যু, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অনিশ্চিত আয়ের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই।

সুন্দরবনই শেষ ভরসা

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম সাতক্ষীরার অনানুষ্ঠানিক জীবিকানির্ভর পরিবারগুলোর মধ্যে ৬৩ শতাংশের আয়ের উৎস হিসেবে মাছ ধরা রয়েছে। একই গবেষণায় দেখা যায়, অনেক পরিবার মাছ, কাঁকড়া, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনে যায়।

তবে এই নির্ভরতা এখন আর আগের মতো নিরাপদ বা স্থিতিশীল নয়। সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা, সংরক্ষিত এলাকা, আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছু মিলিয়ে জেলেদের আয় নির্ভর করছে সীমিত কয়েকটি সুযোগের ওপর।

২০২৫ সালের সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪৫৫ বলা হয়েছিল। এর মধ্যে শ্যামনগরে ২৩ হাজার ৪৫৩ এবং আশাশুনিতে ৮ হাজার ২ জন নিবন্ধিত জেলে ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের সরকারি সহায়তা কর্মসূচির প্রতিবেদনে সুন্দরবননির্ভর নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ও সহায়তার আওতা ভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে। ফলে নিবন্ধনের বছর, এলাকা ও সংজ্ঞার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা প্রয়োজন।

১০৪ দিনের নিষেধাজ্ঞা: জাল গুটিয়ে ঘরে

জেলেদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা। ২০২৫ সালে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরায় দীর্ঘ সময়ের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। একটি প্রতিবেদনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ও সুন্দরবনে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে ১০৪ দিনের কর্মহীনতার কথা উঠে আসে।

২০২৬ সালেও জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ধরায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সরকারের যুক্তি—প্রজনন মৌসুমে মাছের বংশবৃদ্ধি ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে দীর্ঘ বিরতির পর আবার জেলে ও বনজীবীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞা পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সরাসরি অর্থ হলো—যে মানুষটির প্রতিদিনের আয় নদী থেকে আসে, কয়েক মাস তার নৌকা ও জাল ঘরে পড়ে থাকে।

সহায়তা আছে, কিন্তু প্রশ্নও আছে

নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের সহায়তায় ২০২৬ সালে নতুনভাবে ভিজিএফ চাল বিতরণ শুরু করে সরকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবননির্ভর ১৮ হাজার ৫০০ নিবন্ধিত জেলে পরিবারের মধ্যে প্রথম ধাপে ৮ হাজার ২৭১ পরিবারকে জুলাই ও আগস্ট মাসের জন্য মোট ৮০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ২ হাজার ৫৭৪ পরিবার পেয়েছে ২০৫ দশমিক ৯২ মেট্রিক টন চাল।

এই উদ্যোগ জেলে পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—নিবন্ধিত সব পরিবার কি সময়মতো সহায়তার আওতায় আসছে? ২০২৫ সালের স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গিয়েছিল, নিবন্ধিত জেলের তুলনায় সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক কম।

অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার আওতা ও তালিকা কতটা বাস্তবভিত্তিক—এটি ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একদিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে অবৈধ মাছ শিকার

আরেকটি জটিলতা হলো নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও কিছু মানুষ গোপনে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে। ২০২৬ সালের আগস্টে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অবৈধভাবে মাছ ধরার অভিযোগে তিন জেলেকে আটক করা হয় এবং প্রায় আড়াই মণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জাল ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

২০২৫ সালেও সাতক্ষীরা রেঞ্জের অভয়ারণ্য এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অভিযোগে অভিযান ও আটকের ঘটনা ঘটেছিল।

এখানে সমস্যাটি দ্বিমুখী। একদিকে প্রকৃত জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে আয় হারান, অন্যদিকে অবৈধভাবে মাছ ধরার সুযোগ তৈরি হলে সংরক্ষণনীতির কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নজরদারি ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নদীতে শুধু মাছের ভয় নয়

সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া মানেই শুধু নদীর স্রোত ও আবহাওয়ার ঝুঁকি নয়। জলদস্যুদের হামলা ও মুক্তিপণের ভয়ও জেলেদের জীবনে বাস্তব ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।

২০২৬ সালের মার্চে শ্যামনগরের দুই জেলেসহ ছয়জনকে সুন্দরবনে একটি জলদস্যু দলের কাছ থেকে কোস্টগার্ড উদ্ধার করে। তাঁদের কয়েকদিন ধরে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বলে কোস্টগার্ড জানিয়েছিল।

এপ্রিল ২০২৬-এ কোস্টগার্ড জানায়, আগের ১৬ মাসে সুন্দরবনকেন্দ্রিক অভিযানে ৬১ জন জলদস্যুকে গ্রেপ্তার, ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময় শ্যামনগরের হোগলদারা খাল থেকেও তিন জেলেকে উদ্ধার করা হয়।

জুন ২০২৬-এ শ্যামনগরের তিন বাসিন্দাকে একটি কথিত জলদস্যু বাহিনীর সদস্য হিসেবে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই চক্র জেলে ও বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করত।

অর্থাৎ নদীতে নৌকা নামানোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরেক ধরনের অনিশ্চয়তা—ফিরে আসতে পারবেন তো?

জলবায়ু পরিবর্তন বদলে দিচ্ছে পেশা

সাতক্ষীরার জেলেদের সংকট শুধু মাছের পরিমাণ বা নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়। লবণাক্ততা পুরো উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম সাতক্ষীরার ১৮০টি পরিবারের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে ২৭ শতাংশ পরিবার জীবিকার ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। গবেষণায় মাছ ধরা, মাছ ও কাঁকড়া চাষ, কৃষি এবং অন্যান্য পেশার ওপর লবণাক্ততার প্রভাবও উঠে এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, মিঠাপানির সংকট এবং লবণাক্ত পানির বিস্তার যুক্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত জলাবদ্ধতা, খাল পরিবর্তন এবং লবণ পানিনির্ভর চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের বিস্তারও স্থানীয় জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে।

ফলে একসময় যে পরিবার মাছ ধরত, তাদের কেউ এখন কাঁকড়া চাষে যাচ্ছে; কেউ দিনমজুরি করছে; কেউ আবার অন্য এলাকায় কাজ খুঁজছে।

বিকল্প জীবিকা হিসেবে কাঁকড়া চাষ

এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ শ্যামনগরের কাঁকড়া চাষ। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ণ নদীতে মাছ ধরার পরিবর্তে অনেক নারী নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে যুক্ত হয়েছেন। এতে বিশেষ করে নারীদের জন্য স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং কিছু পরিবার সন্তানদের পড়াশোনায় বেশি ব্যয় করতে পারছে।

অর্থাৎ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে বিকল্প জীবিকা কার্যকর হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে হবে। বরং মাছ ধরার সঙ্গে নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

জেলেদের আয়: একদিনের বড় মাছ মানেই সচ্ছলতা নয়

সুন্দরবনের নদীতে কখনো জেলেদের জালে উচ্চমূল্যের বড় মাছ উঠে আসে। ২০২৪ সালে সাতক্ষীরার মালঞ্চ নদীতে ১৯টি মাছ ৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় বিক্রির খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অন্য এক ঘটনায় ২৩টি জাভা ও মেদ মাছ ৪ লাখ ২১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

এ ধরনের ঘটনা সংবাদে আলোড়ন তুললেও এগুলোকে সাধারণ জেলের নিয়মিত আয় হিসেবে দেখা যাবে না। মাছের পরিমাণ ও প্রজাতি প্রতিদিন এক থাকে না। নৌকার খরচ, জ্বালানি, জাল, খাবার, শ্রমিকের ভাগ এবং ঋণের কিস্তি বাদ দিলে মোট বিক্রয়মূল্যের বড় অংশই জেলের হাতে থাকে না।

ফলে একদিন ভালো মাছ পাওয়ার গল্পের আড়ালে রয়েছে বহুদিনের অনিশ্চয়তা।

ঋণ ও দাদনের ফাঁদ

নৌকা, জাল, জ্বালানি ও খাবারের খরচ জোগাতে অনেক জেলেকে আগেই টাকা ধার করতে হয়। এর ফলে মাছ ধরার আগেই অনেক সময় তাদের ভবিষ্যৎ আয় নির্দিষ্ট হয়ে যায়।

দাদননির্ভরতার বিষয়টি সুন্দরবন ও উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতির দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ ব্যবস্থায় জেলে নগদ অর্থ পেলেও পরে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বাজারদরের পুরো সুবিধা জেলে সবসময় পান না।

এই জায়গায় সমবায়ভিত্তিক ঋণ, সহজ শর্তের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন, নৌকা ও সরঞ্জামের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ এবং জেলেদের সরাসরি বাজারসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নারী জেলেদের সংকট আরও গভীর

উপকূলীয় মৎস্যজীবী পরিবারে নারীর শ্রম অনেক সময় পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে ধরা পড়ে না। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে শ্যামনগরে ১৬ হাজার ৮৫৮ জন কার্ডধারী জেলের মধ্যে ৭ হাজার ৭৩ জন নারী কার্ডধারী জেলে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে পুরুষ নিবন্ধিত জেলেরা খাদ্য সহায়তা পেলেও নারী জেলেদের জন্য আলাদা প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই।

অন্যদিকে শ্যামনগরের কিছু এলাকায় নারীরা এখন কাঁকড়া চাষে যুক্ত হয়ে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করছেন।

এখানে নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে নারী মাছ ধরা, মাছ বাছাই, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা কাঁকড়া চাষে যুক্ত, তাকে শুধু ‘জেলে পরিবারের সদস্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, নাকি আলাদা অর্থনৈতিক কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে?

নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, কিন্তু বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও প্রয়োজন

সুন্দরবনের মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার চাপ কমানো হলে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু সংরক্ষণনীতির সফলতা নির্ভর করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ওপর। জেলে যদি মনে করেন নিষেধাজ্ঞার পুরো বোঝা তার পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে, অথচ বিকল্প আয় নেই, তাহলে নিয়ম ভাঙার অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

তাই একটি কার্যকর ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় একসঙ্গে থাকা প্রয়োজন—সম্পদ সংরক্ষণ, প্রকৃত জেলের সঠিক তালিকা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা।

সামনে কী করতে হবে

সাতক্ষীরার জেলেদের জীবনকে টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি—

প্রথমত, প্রকৃত জেলেদের ডিজিটাল ও হালনাগাদ নিবন্ধন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা পাওয়ার তালিকায় প্রকৃত জেলেদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং সহায়তার পরিমাণ বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, জেলেদের জন্য বিকল্প জীবিকা—কাঁকড়া চাষ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকনো মাছ, নৌকা মেরামত, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দক্ষতা উন্নয়ন—বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, দাদননির্ভরতা কমাতে সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ এবং সরাসরি বাজারে মাছ বিক্রির সুযোগ তৈরি করা দরকার।

পঞ্চমত, সুন্দরবনে জলদস্যু দমন ও জেলেদের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

ষষ্ঠত, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে উপকূলীয় এলাকায় মিঠাপানি সংরক্ষণ, জলব্যবস্থাপনা এবং টেকসই মৎস্যচাষের উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

শেষ কথা

সাতক্ষীরার জেলে শুধু একজন মাছ শিকারি নন। তিনি উপকূলীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অন্যতম জীবন্ত প্রতিনিধি।

তার নৌকা নদীতে ভাসে, কিন্তু তার জীবিকা নির্ভর করে আবহাওয়া, মাছের প্রাপ্যতা, বন বিভাগের নিয়ম, বাজারদর, ঋণ, জলদস্যু এবং সরকারি সহায়তার ওপর।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে যখন জেলেরা আবার সুন্দরবনের নদীতে ফিরেছেন, তখন তাঁদের চোখে নতুন আশার পাশাপাশি পুরোনো অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

সুন্দরবন বাঁচাতে জেলেদের জীবিকা রক্ষা করতে হবে—আবার জেলেদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের মাছ ও জীববৈচিত্র্যও রক্ষা করতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সাতক্ষীরার উপকূলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর