শিরোনাম

করতোয়া নদীর রক্ষাবাঁধ দখল করে বহুতল ভবন, দোকানসহ নানা স্থাপনা

করতোয়া নদীর রক্ষাবাঁধ দখল করে বহুতল ভবন, দোকানসহ নানা স্থাপনা

পঞ্চগড়ে নদীর জায়গায় গড়ে উঠছে স্থাপনা, নীরব পানি উন্নয়ন বোর্ড-পৌরসভা!

 

পঞ্চগড়ে করতোয়া নদীর রক্ষাবাঁধ দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, সেমিপাকা বাড়ি, দোকানসহ নানা স্থাপনা। কোথাও বাঁধের ব্লক সরিয়ে নদীর জায়গায় বালু ভরাট করা হয়েছে, কোথাও নির্মাণ করা হয়েছে আরসিসি পিলার ও ইটের সীমানাপ্রাচীর। এমনকি নদীর জায়গায় গাছ লাগিয়েও দখল পাকাপোক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

পঞ্চগড় পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনগড় সিনেমাহল এলাকা থেকে রাজনগড় খালপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সরেজমিন ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র নদীর রক্ষাবাঁধ ও তীরবর্তী সরকারি জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এসব দখলের পেছনে বিভিন্ন সময়ের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।

তবে কোন স্থাপনা অনুমোদিত আর কোনটি অনুমোদনহীন—তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, নদীর রক্ষাবাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিন কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি?

দুই শতকের বেশি নদীর জায়গা দখলের অভিযোগ

রক্ষাবাঁধ দখলকারীদের একজন প্রবাসী ফিরোজ আহাম্মেদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি ২ শতক ১০ পয়েন্ট জমি কিনলেও এর বাইরে নদীর আরও দুই শতকের বেশি জায়গা দখল করে তিনতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। একই সঙ্গে বাঁধের ব্লক সরিয়ে বালু ভরাট করে ভবনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

নদীর পাড় ঘেঁষে আরসিসি পিলার দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে সেখানে মেহগনি গাছের চারাও লাগানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজ আহাম্মেদ বলেন, “নদীর জায়গা দখল করিনি। সেখানে একটি গাইড ওয়াল দেওয়া হয়েছে, যাতে পানিতে বাড়ির ক্ষতি না হয়। পৌরসভার লোকজন এসে জায়গা দেখে গেছে। বাড়তি যে জায়গাটুকু করা হয়েছে, সরকারের যখন প্রয়োজন হবে তখন ভেঙে দেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, আগের সরকারের সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক পক্ষের স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‘ফাঁকা জায়গা দেখে বাথরুম করেছি’

শহীদুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা নদীর জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “যে জায়গাতে বাড়ি করে আছি সেখানে আসলে জায়গা হচ্ছে না। এ কারণে ভাবলাম, ওদিকে তো জায়গা ফাঁকা আছে। তাই একটু জায়গায় বাথরুমের কাজ করেছি। সরকার যদি নিয়ে নেয়, তাহলে আমাদের করার কিছু নেই।”

অন্যদিকে কয়েকজন দখলকারী নিজেদের জায়গাতেই স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেন।

ক্ষোভ স্থানীয়দের

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একসময় করতোয়ার পাড়ে বসে নির্মল বাতাস উপভোগ করা গেলেও এখন নদীর জায়গা দখল করে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে। বাঁধের ব্লক সরিয়ে নির্মাণকাজ চলায় ভবিষ্যতে নদীর তীর ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা তাঁদের।

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম ইরান বলেন, রাজনগড় সিনেমাহল থেকে খালপাড়া পর্যন্ত নদীর জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তাঁর প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বিষয়টি জানে, তাহলে এতদিনেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

গৃহিণী মুন্না আক্তার বলেন, “আগে নদীর ধারে বসে একটু বাতাস খেতাম। এখন নদীর জায়গা দখল করে মানুষ বাড়িঘর নির্মাণ করছে। এসব জায়গা দ্রুত দখলমুক্ত করা না হলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।”

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

পঞ্চগড় পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রণব সাহা বলেন, নদীর জায়গায় কেউ বহুতল ভবন নির্মাণ করে থাকলে লোক পাঠিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদনের কাগজপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মন বলেন, নদী দখলের একটি তালিকা করা হচ্ছে। কেউ নদীর জায়গা দখল করে থাকলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, তালিকা তৈরির পাশাপাশি দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত ও উচ্ছেদ করতে হবে। করতোয়া নদীর রক্ষাবাঁধ ও তীরবর্তী সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনারও দাবি তাঁদের।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর