শিরোনাম

১১৭ দিন পর লেবানন থেকে ফিরল কলারোয়ার শুভর লাশ

১১৭ দিন পর লেবানন থেকে ফিরল কলারোয়ার শুভর লাশ

লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার কলারোয়ার শুভ দাসের মরদেহ ১১৭ দিন পর দেশে ফিরেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে তার মরদেহ পৌঁছে উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের বাড়িতে।

কফিনবন্দী ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। শুভকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ছুটে আসেন গ্রামের মানুষ। এ সময় সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ।

এর আগে শনিবার রাত ৯টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুভর মরদেহ গ্রহণ করেন তার ভাই। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রোববার সকালে খুলনা থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. মঈনুল ইসলাম শুভর বাড়িতে উপস্থিত হন। তিনি শুভর শেষকৃত্য ও পরিবহন ব্যয় বাবদ দুই দফায় মোট ৮৫ হাজার টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেন।

দীর্ঘ ১১৭ দিনের অপেক্ষার অবসান হলেও পরিবারের শোক যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। যে ছেলেকে ঘিরে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল পরিবার, সেই শুভ ফিরেছেন কফিনবন্দী হয়ে। তার মরদেহ ফিরলেও সঙ্গে ফিরেছে পরিবারের পুরোনো ঋণের বোঝা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা।

বাড়ি বিক্রি করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল শুভকে

চলতি বছরের ১১ মে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের সময় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন শুভ দাস। একই ঘটনায় সাতক্ষীরার আরও দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামও নিহত হন।

অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় তিন বছর আগে শুভকে লেবাননে পাঠিয়েছিলেন তার বাবা সুরঞ্জন দাস। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর খরচ জোগাতে নিজের শেষ সম্বল এক শতক জমির ওপর থাকা বাড়িটি বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি সমিতি ও স্থানীয়দের কাছ থেকে চড়া সুদে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নেন।

লেবাননে শুভ একটি বাড়ি দেখাশোনার পাশাপাশি বাড়িসংলগ্ন বাগানে কাজ করতেন। প্রতি মাসে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা পাঠাতেন তিনি। সেই অর্থে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত। মৃত্যুর আগে টানা দুই মাস তিনি দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি।

বাবার দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভাই-বোন

স্থানীয়রা জানান, শুভর বাবা সুরঞ্জন দাস ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাড়ি বিক্রি করার পর স্ত্রী, ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে একই গ্রামের অন্যের বাড়িতে মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়ায় থাকছেন তিনি।

শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ভাই সুদীপ স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শুভর বাবা সুরঞ্জন দাস বলেন, “দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ছেলের মরদেহ ফিরে পেয়েছি। অন্তত শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছি।”

তিনি বলেন, ছেলে সংসারের হাল ধরবে—এই আশায় বাড়ি বিক্রি করে এবং ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন ছেলে নেই, কিন্তু ঋণ রয়ে গেছে। অন্যের বাড়িতে ভাড়া থেকে কীভাবে সংসার চালাবেন, সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস প্রশাসনের

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, শুভর পরিবার যাতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পায়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের খুলনা বিভাগীয় অফিসের কাউন্সিলর মইন উদ্দীন জানান, সরকারের পক্ষ থেকে লাশ সৎকার ও পরিবহন ব্যয় বাবদ ৮৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে আরও ৩ লাখ টাকা এবং কয়েক মাস পর জীবনবীমার অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে।

শুভর মরদেহ ফিরেছে ১১৭ দিন পর। কিন্তু পরিবারের জন্য অপেক্ষা শেষ হলেও শেষ হয়নি সংগ্রাম—ছেলেকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন তাদের লড়তে হবে ঋণের বোঝা, সংসারের অনিশ্চয়তা এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর