গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পে ভয়াবহ অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। গ্যাসের অভাবে ডাইং কারখানায় কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় ধীর হয়ে পড়েছে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া। ফলে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং থেকে শুরু করে রপ্তানি শিপমেন্টেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। উদ্যোক্তারা জানান, দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা থাকা কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। গ্যাসের অভাবে ডাইংয়ে কাপড় প্রস্তুত না হওয়ায় পরবর্তী ধাপের কারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি পর্যায়ে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পুরো শিল্পে ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্যোক্তারা জানান, আগে সীমিত আকারে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে কিছু কারখানা উৎপাদন চালিয়ে রাখলেও নতুন নির্দেশনার কারণে সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পণ্য পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে একদিকে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর ক্রেতাদের আস্থাও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। ডাইংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়েও।
তিনি বলেন, বিদেশি বায়াররা চুক্তি অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে। একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং মাঝারি কারখানায় প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
ফতুল্লার পঞ্চবটী বিসিক হোসিয়ারি পল্লি মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম জানান, গার্মেন্টস কারখানার অনেকগুলো বন্ধ থাকলেও ৪৬৫টি নিটিং কারখানা চালু রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং সেই সুযোগে নিটিং কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন করা হবে।
এদিকে গ্যাস সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু পোশাক কারখানা ছুটি সমন্বয় করে বন্ধ রেখেছে। সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন কারখানায় অতিরিক্ত ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার বেশিরভাগই সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিসিকের বাইরের রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অনেক কারখানাতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত ইতোমধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহী হচ্ছেন। এসব অর্ডার ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়বে এবং দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পের সংকট আরও প্রকট হতে পারে। এতে উৎপাদন ও রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।