বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ববিতা শুধু একজন নায়িকার নাম নয়—তিনি একটি যুগের প্রতীক। সৌন্দর্য, অভিনয় আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা আজও কিংবদন্তিতুল্য। পর্দার এই রহস্যময়ী নায়িকার ব্যক্তিজীবন নিয়েও ছিল মানুষের তুমুল কৌতূহল। বিশেষ করে তাঁর বিয়ে ঘিরে তৈরি হয়েছিল একের পর এক রহস্য ও গুঞ্জন।
১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর। ববিতাকে ঘিরে তখন চলচ্চিত্রাঙ্গনে নানা আলোচনা। এর মধ্যেই ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে আয়োজন করা হলো এক জমকালো অনুষ্ঠান। আমন্ত্রণ জানানো হলো সাংবাদিক, সম্পাদক, চলচ্চিত্রাঙ্গনের বিশিষ্টজন, আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে।
কিন্তু অনুষ্ঠানটি কেন—তা কেউ জানতেন না।
সাংবাদিকদের মধ্যেও চলছিল নানা কানাঘুষা। কেউ ভাবছিলেন, হয়তো নতুন কোনো সিনেমার ঘোষণা আসছে। কেউ আবার অনুমান করছিলেন অন্য কিছু।
ববিতার দুই বোন সুচন্দা ও চম্পাও ছিলেন অনুষ্ঠানে। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তাঁরাও রহস্য ভাঙলেন না। বরং বললেন, হয়তো ববিতা নতুন কোনো সিনেমার ঘোষণা দেবেন।
তারপরই বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট।
গাড়ি থেকে ববিতা নামতেই উপস্থিত সাংবাদিক ও অতিথিদের চোখ আটকে গেল তাঁর দিকে। নববধূর সাজে ববিতা। পরনে সোনালি রঙের কারুকাজ করা কাতান শাড়ি। কানে ঝুমকা, গলায় চার লহরীর নেকলেস, দুই হাতে চুড়ি, সিঁথিতে টিকলি। বড় করে বাঁধা খোঁপায়ও ছিল অলংকারের সাজ।
তাঁর পাশে স্যুট-কোট পরা এক ভদ্রলোক।
তিনি ইফতেখারুল আলম—জাহাজ ব্যবসায়ী।
ববিতা তাঁর হাত ধরে হাসতে হাসতে বলরুমে প্রবেশ করলেন। মুহূর্তেই বড় বোন সুচন্দা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা দিলেন—ফরিদপুরের আবদুল জলিলের ছেলে ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ফরিদা আক্তার পপির শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮২।
এক মুহূর্তে সব রহস্যের অবসান।
বলরুম ভরে গেল করতালিতে।
বিয়েটি হয়েছিল সেদিন সকাল ১০টায়। সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখে ববিতা বারবার বলছিলেন, তিনি বেশ নার্ভাস।
তবে বিয়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল কাবিন।
দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ লাখ টাকা। কাবিননামায় কোনো উসুল দেখানো হয়নি। রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল ২৫ হাজার টাকা। আর কাজিকে দেওয়া হয়েছিল ৫০০ টাকা। ১৯৮২ সালের অর্থমূল্যের বিবেচনায় ৫০০ টাকাও ছিল কম নয়।
বিয়েতে ববিতাকে দেওয়া হয়েছিল হীরার সেট। ছিল একাধিক সোনার সেটও। সোনার গয়নার মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ১০০টি শাড়ি।
বিয়ের শাড়িটিও ছিল বিশেষ পছন্দের।
লাল শাড়ি পরতে রাজি ছিলেন না ববিতা। তাই তাঁর জন্য বেছে নেওয়া হয় সোনালি রঙের কাতান। সাংবাদিকরা শাড়িটির নাম জানতে চাইলে ববিতা সেটি প্রকাশ করতে চাননি।
অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন প্রায় ৮০ জন। তাঁদের বড় অংশই ছিলেন ববিতার আত্মীয়স্বজন। ইফতেখারুল আলমের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন অল্প কয়েকজন। তাঁর মা অবশ্য অনুষ্ঠানে ছিলেন না।
অতিথিদের মধ্যে ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক ও তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী। ববিতা নিজেই অতিথিদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন।
বিয়ের পর গুলশানের স্বামীর ভাড়া করা বাড়িতে সংসার শুরু করেন ববিতা। যদিও গুলশানেই তাঁর নিজের বাড়ি ছিল। বিয়ের পরপরই স্বামীকে নিয়ে আজমীর শরীফ জিয়ারতেও যান তিনি।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, নতুন জীবনের গল্পটা বুঝি সুখেই এগোচ্ছে।
কিন্তু সেই সুখের আকাশে খুব বেশিদিন নির্মলতা থাকেনি।
গুঞ্জন ছিল আগেই
ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ববিতার বিয়ের আগে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছিল। এমনকি তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলেও আলোচনা চলত। তবে ববিতা কখনো প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেননি।
এই জায়গাতেই যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠতেন ববিতা।
চারপাশে যত গুঞ্জনই থাকুক, তাঁকে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা যেত না। ছিলেন শান্ত, সংযত ও নিজের মতো। যেন চারপাশে উত্তাল সমুদ্র, আর তার মাঝখানে তিনি এক শান্ত, স্থির নৌকা।
কিন্তু সেই স্থিরতার আড়ালে ব্যক্তিজীবনে কী চলছিল—তা জানতে শুরু করেন মানুষ পরে।
বিয়ের পাঁচ বছর পর ভাঙনের শুরু
বিয়ের কয়েক বছর পর দাম্পত্য জীবনে দেখা দেয় টানাপোড়েন। অবশেষে ১৯৮৭ সালের ২৪ মে ববিতা প্রথম দফায় ইফতেখারুল আলমকে ডিভোর্স দেন।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।
মাত্র দুই দিন পর, ২৬ মে, ইফতেখারুল আলমের দেওয়া চরিত্র সংশোধনের প্রতিশ্রুতির পর ববিতা তাঁকে আবার বিয়ে করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, যে বিয়ে শুরু হয়েছিল ৫০ লাখ টাকার দেনমোহর, সোনালি কাতান, হীরার গয়না আর পাঁচ তারকা হোটেলের ঝলমলে আয়োজন দিয়ে—সেই দাম্পত্যেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে নেমে এসেছিল বিচ্ছেদের অন্ধকার।
ববিতা বরাবরই ছিলেন রহস্যময়ী। পর্দায় তাঁর হাসি ছিল দর্শকের মুগ্ধতার কারণ, আর বাস্তব জীবনের নীরবতা ছিল আরও বড় রহস্য।
তাঁর বিয়ের সেই জমকালো আয়োজনের আড়ালে কী ছিল? কী কারণে দাম্পত্যে এত দ্রুত ফাটল ধরেছিল? কেন ডিভোর্সের মাত্র দুই দিনের মধ্যেই আবার সেই সম্পর্ক জোড়া লাগল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে ববিতার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে।