তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আবারও সুন্দরবনে ফিরতে শুরু করেছেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার হাজারো বনজীবী। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে মহাজনী ঋণ ও এনজিওর কিস্তি শোধের আশায় নতুন মৌসুম শুরু করেছেন তাঁরা। তবে জীবিকার এই পথেও স্বস্তি নেই। বনদস্যুদের চাঁদাবাজির অভিযোগ, বাঘের আক্রমণের ঝুঁকি ও নৌপথের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন বনজীবীরা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিস থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া শুরু হয়। সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান। বৃষ্টির কারণে প্রথম দিনে উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বন বিভাগ জানিয়েছে, বুড়িগোয়ালিনী অফিস থেকে ১৫৫ জন বনজীবী পাস নিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে চার শতাধিক বনজীবী সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। একই সময়ে ২৫ জন পর্যটকও বৈধভাবে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন।

তিন মাসের বেকারত্বে ঋণের ফাঁদ
নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালসহ সুন্দরবননির্ভর বহু মানুষ কার্যত কর্মহীন ছিলেন। বিকল্প কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় সংসার চালাতে অনেকে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। পাশাপাশি এনজিওর কিস্তি, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে বেড়েছে আর্থিক চাপ।
গাবুরার জেলে আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন কোনো আয় না থাকায় ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন সুন্দরবন থেকে আয় করে সেই দেনা শোধের আশা করছেন।
বুড়িগোয়ালিনীর জেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিন মাস সুন্দরবনে যেতে না পারায় তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। মাছ ধরে দেনা শোধের আশা থাকলেও দস্যুদের চাঁদা দিতে হলে আয়ের বড় অংশ চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএলসি নবায়নে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ
বনজীবীদের অভিযোগ, বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়নে নির্ধারিত সরকারি ফি ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হলেও বিভিন্ন খাতে লাইসেন্সপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাতক স্টেশনে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের অনেকে প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্টদের নাম বলতে রাজি হননি। তাঁদের আশঙ্কা, নাম প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে বন বিভাগের সেবা নিতে হয়রানির শিকার হতে পারেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসে সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনে মোট ২ হাজার ৬৬৯টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনীতে ১ হাজার ১৬টি, কদমতায় ৬২৩টি, কৈখালীতে ৪৩৮টি এবং কোবাতকে ৫৯২টি।
অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা সব ধরনের নৌকার জন্য প্রযোজ্য চূড়ান্ত ফি নয়; নৌকার ধরন ও আকারভেদে সরকারি ফি ভিন্ন হতে পারে।
এসিএফ মো. মশিউর রহমান বলেন, বিএলসি নবায়নে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 01.09.26.jpg)
দস্যুমুক্ত সুন্দরবনে ফের আতঙ্ক
২০১৮ সালে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হলেও বনজীবীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কয়েকটি দস্যু দল আবার সক্রিয় হয়েছে। জেলেদের দাবি, সুন্দরবনে প্রবেশ ও নদীপথে নৌকা চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়।
একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, মহাজনের মাধ্যমে চাঁদা দেওয়ার পর তাঁদের হাতে ৫ টাকার একটি নোট দেওয়া হয়। নোটের সিরিয়াল নম্বর দেখেই নদীপথে নৌকা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয় বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, সুন্দরবনের দস্যু চক্র নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা পুলিশকে না জানিয়ে গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে স্বজনদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পর্যাপ্ত নৌযান না থাকায় সুন্দরবনসংলগ্ন সব নদী ও নৌপথে নিয়মিত টহল দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে অপরাধ দমন ও বনজীবীদের নিরাপত্তায় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দস্যুর পাশাপাশি বাঘের ভয়
বনদস্যুদের পাশাপাশি বাঘের আক্রমণও বনজীবীদের জন্য বড় ঝুঁকি। বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, গত এক দশকে সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় বাঘের আক্রমণে অন্তত ১২ থেকে ১৫ জন বনজীবী নিহত হয়েছেন। আহত ও নিখোঁজের ঘটনাও রয়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে নোটাবেকী বনাঞ্চলে মধু সংগ্রহের সময় বাঘের আক্রমণে গাবুরা ইউনিয়নের মৌয়াল ময়নুদ্দিন গাজী নিহত হন। ২০২২ সালের মার্চে কলাগাছিয়া এলাকায় মধু সংগ্রহের সময় নিহত হন মৌয়াল হাবিবুর রহমান। ২০২১ সালে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের হামলায় নিহত হন জেলে মীরবাশার গাজী। চলতি বছরের জুলাইয়ে গাবুরার বাবলু গাজীও মধু আহরণের সময় বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় নিয়ম ভেঙে বা পাস-পারমিট ছাড়া নিষিদ্ধ খাঁড়ি ও গভীর বনে প্রবেশ করায় ঝুঁকি বাড়ে।
এসিএফ মো. মশিউর রহমান জানান, বন্যপ্রাণীর হামলায় নিহত বনজীবীদের পরিবারকে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহতদের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

আহরণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি
বনজীবীদের দাবি, অভয়ারণ্যসহ সংরক্ষিত এলাকার কারণে বৈধভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ সীমিত। জীবিকার স্বার্থে সুন্দরবনের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকায় মাছ-কাঁকড়া আহরণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, বনজীবীদের জীবিকার পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বৈধ এলাকায় আহরণের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পর্যটন ব্যবসায়ও ক্ষতি
তিন মাস পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিন চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক পর্যটকবাহী ট্রলার অলস পড়ে ছিল।
মুন্সীগঞ্জ এলাকার পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক নূর ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ট্রলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছে। মেরামতের জন্য তাঁকে ঋণ করতে হয়েছে।
তিন মাসের কর্মহীনতা শেষে সুন্দরবন খুললেও স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি বনজীবীদের জীবনে। ঋণ শোধের আশায় তাঁরা বনে ফিরেছেন, কিন্তু সামনে দস্যুদের চাঁদাবাজির অভিযোগ, বাঘের ভয় এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা। ফলে সুন্দরবনে নতুন মৌসুমের যাত্রা শুরু হয়েছে আশা ও আতঙ্ক—দুইয়ের মাঝখানে।