শিরোনাম
Ad Image

বিপ্লবের মাধ্যমে উত্থান যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠেছিলেন খামেনি

বিপ্লবের মাধ্যমে উত্থান যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠেছিলেন খামেনি

বিপ্লবের মাধ্যমে উত্থান

যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠেছিলেন খামেনি

বিশ্ববেলা ডেস্ক 8 তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। সেই থেকেই তিনি রাষ্ট্রের সামরিক, বিচারিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হাতে নেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাতের পর ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র। নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদ থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত হয় একজন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। খোমেনি ছিলেন প্রথম সর্বোচ্চ নেতা; তার মৃত্যুর পর প্রশ্ন ওঠে, কে নেবেন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সে সময় আলি খামেনি ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য যে উচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা—‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ প্রয়োজন ছিল, তা তার ছিল না। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের হিসাব কষে বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে নির্বাচিত করে। পরে সংবিধানে সংশোধন এনে শর্ত শিথিল করা হয় এবং খামেনিকে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদবিতে উন্নীত করা হয়। একই সংশোধনীতে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানো হয়, যদিও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় সর্বোচ্চ নেতার কাছেই। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হন। দেশটির ইসলামী + বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরসহ সব নিরাপত্তা কাঠামো তার অধীন ছিল। বিচার বিভাগের প্রধান, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়োগেও তার প্রভাব ছিল নির্ধারক। ফলে নির্বাচনী রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকেও তিনি রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মত দিতেন। খামেনির শাসনামলে ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। সংস্কারপন্থি মোহাম্মদ খাতামি পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সামাজিক উদারীকরণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু খামেনির রক্ষণশীল অবস্থানের কারণে তার অনেক উদ্যোগ সীমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় এলে প্রথমদিকে তাকে খামেনির ঘনিষ্ঠ মনে করা হলেও অর্থনীতি ও ক্ষমতার প্রশ্নে তাদের মধ্যেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। ২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হলে খামেনি নির্বাচনের ফল বৈধ ঘোষণা করেন এবং কঠোর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন। এতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৩ সালের মধ্যপন্থি নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বিশ্বশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির অনুমোদনেই সম্পন্ন হয়, যা দেখায় যে কৌশলগত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার হাতেই ছিল। তবে নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে রুহানির উদ্যোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে ইরাকের মাটিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি। তার মৃত্যুতে খামেনি প্রতিশোধের ঘোষণা দেন এবং ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। একই বছর ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ভূপাতিত হলে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। খামেনি দুঃখ প্রকাশ করলেও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেন। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ভোট দেয়। তবে প্রার্থিতা যাচাই করে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, যার সদস্যদের নিয়োগে সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। ফলে কাঠামোগতভাবে এই পদে নির্বাচিত হওয়ার পর আজীবন দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। ১৯৮৯ সালে ধর্মীয় মর্যাদার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এরপর তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক কৌশল ও বৈশ্বিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার উত্থান শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে কাজ করে—তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু

আপনার মতামত লিখুন
Ad Image
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর