বিশ্ববেলা ডেস্ক 8 চির শত্রু থেকে বন্ধু, ফের শত্রু—এমন সমীকরণে চলছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ইতিহাস। এ দ্বন্দ্বের শুরু সেই ব্রিটিশ শাসন থেকে। আর এখন চলছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ। চলমান সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায় ইসলামাবাদ। এতে অন্তত ৮০ জন নিহত হন, যা পুরোনো আগুনেই নতুন করে ঘি ঢেলেছে। যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয় তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। এরপর গত শুক্রবার এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান। এরপর শুরু হয় নতুন সংঘাত। পেছনে দেখা: ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের তৎকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াও সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের কাছে এসে হাজির হয়। ১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশরা হামলা চালায় আফগানিস্তানে। এবার অদম্য আফগানরা সীমিত আকারে পরাজিত হয়। যুদ্ধ শেষে সমুদ্র সংলগ্ন আফগানিস্তানের অংশ এবং সিন্ধু নদের তীরবর্তী অংশগুলো ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়, যার ফলে পশতুন অঞ্চলও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে ব্রিটিশ ভারত এবং আফগানিস্তানের মাঝে। ভারতবর্ষের সীমানা গিয়ে সিন্ধু নদ থেকে প্রসারিত হয়ে তৈরি হয় ডুরান্ড লাইন। ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের দুটি সেই হিসেবে ডুরান্ড লাইনের সৌজন্যে পাওয়া। সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশ নিয়ে আফগানিস্তানের কোনো দাবি না থাকলেও বেলুচিস্তান এবং খায়বার পাখতুনখোয়া (পূর্বের নাম উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এখনো নিজেদের অংশ মনে করে তারা। এ কারণেই তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের বিরোধিতা করেছিল। ভাগ হয়েছে পশতুন এলাকা: পশতুন জাতিগোষ্ঠীকে দুভাগে বিভক্ত করেছে এ কৃত্রিম লাইন। অথচ পশতুনদের মধ্যে নেই কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভেদ। পেশোয়ার, খাইবার, সোয়াত, চিত্রাল, ওয়ারিজিস্তানের মতো আজন্ম পশতুন ভূমিকে আফগানিস্তান থেকে কেড়ে নিয়েছে এ ডুরান্ড লাইন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঠেকাতে না পারলেও ডুরাল্ড লাইনে বিভক্ত পশতুন জাতির বিদ্রোহীদের সবসময় মদদ দিয়ে এসেছে আফগানিস্তানের সরকারগুলো। পশতুনরা চাইতেন পাকিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল নিয়ে আলাদা পশতুনিস্তান (পাখতুনিস্তান) গঠন করতে, যা একসময়ে আফগানিস্তানে যোগ দেবে এ আশায় কাবুল তাদের সহায়তা করত। বিষয়টি নিয়ে কখনোই সুরাহা হয়নি। টিটিপির উত্থান ও আজকের সংকট: ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় মুজাহিদিন গড়ে তোলে। নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তান সমর্থন দেয় তালেবানকে, যাতে কাবুলে অনুগত সরকার থাকে; কিন্তু ৯/১১-র পর ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ালে চরমপন্থিদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ২০০৭ সালে গঠন করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই সশস্ত্র লড়াই শুরু করে। ২০২১ সালে তালেবান আবার কাবুল দখল করলে পাকিস্তান ভেবেছিল পরিস্থিতি অনুকূলে যাবে; কিন্তু উল্টো টিটিপির তৎপরতা বাড়ে, সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং বিমান হামলা-পাল্টা হামলায় সম্পর্ক তীব্র সংঘাতে রূপ নেয়। ডুরান্ড লাইনের পুরোনো দাগ আজও রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে আছে।
সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু