ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ছড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে
পাল্টাপাল্টি হামলা
রয়টার্স ও পলিটিকোর প্রতিবেদন
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় খামেনি ও পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন, জানিয়েছে রয়টার্স হামলায় ইরানে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী নিহত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ইরান আক্রান্ত হওয়ার পর ইসরায়েল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা
ইরান যদি মনে করে শাসন ব্যবস্থায় টিকে থাকা হুমকির মুখে, তাহলে শুধু ইসরায়েল বা আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই নয়, বৈশ্বিক পরিসরে সাইবার ও অপরিমিত হামলাও হতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, ‘সীমিত সংঘাত’ ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে
বিশ্ববেলা ডেস্ক 8 যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গতকাল শনিবার সকালে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। তেহরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাতের মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি দূর করবে। একই সঙ্গে ইরানিদের জন্য তাদের শাসক উৎখাত করার সুযোগ তৈরি করবে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এ হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। আর ইরান হুমকি দিয়েছে, শত্রুদের নির্মূল না করা পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যাবে তেহরান। ইরান ও তার দীর্ঘদিনের শত্রুদের মধ্যে এ নতুন সংঘাত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আশাকে আরও ক্ষীণ করে তুলেছে। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের উল্লেখ ট্রাম্পের: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের বিরোধের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে বিভিন্ন হামলার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সব জায়গায় বোমা পড়বে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই হবে। সম্ভবত পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’ মার্কিন দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। আকাশ ও সমুদ্রপথে এ অভিযানের পরিধি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে এক কর্মকর্তা জানান, এ অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার একটি বড় বাধা ছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি নির্মূল করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’ ইরানিদের প্রতি ‘স্বৈরশাসনের জোয়াল’ সরানোর আহ্বান ইসরায়েলের: ইরানিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা ‘সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে।’ যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের সব স্তরের মানুষের জন্য সময় এসেছে...স্বৈরশাসনের জোয়াল ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার এবং একটি মুক্ত ও শান্তিকামী ইরান গড়ে তোলার।’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তেহরানে নেই। তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এ হামলা হলো। ইরান যদি তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে আবারও হামলা করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার হুমকি দিয়ে আসছিল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে এবং হুমকি দূর করতে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ হামলা শুরু করেছে। ইসরায়েল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে পবিত্র রমজান মাসে এ হামলা চালিয়েছে। আবার এ হামলা ইহুদি সম্প্রদায়ের উৎসব ‘পুরিমে’র ঠিক আগে করা হলো। পুরিম উৎসব প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে ফেরার স্মৃতিতে পালন করা হয়, যা আগামী সোমবার শুরু হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের পরিকল্পনা: ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েক মাস ধরে এ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। হামলার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগেই ঠিক করা হয়েছিল। গতকাল তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পুরো ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য জনগণকে প্রস্তুত রাখতে এ আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল। তবে উগ্রবাদী নেতানিয়াহু সরকার বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যে কোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করলে হবে না। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ইরান বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হয়নি। তেহরান আরও বলেছিল, যে কোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দিয়েছিল, যা ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ। তেহরান তখন কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল-উদাইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিল। পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে। এখন তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে। কৌশলগত লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট: অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জনাথন প্যানিকফের পর্যবেক্ষণ, সামরিক পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে—কিন্তু স্পষ্ট লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া ঝুঁকি বেড়ে যায়। তার ভাষায়, ইরান যদি মনে করে শাসন ব্যবস্থায় টিকে থাকা হুমকির মুখে, তাহলে শুধু ইসরায়েল বা আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই নয়, বৈশ্বিক পরিসরে সাইবার ও অপরিমিত হামলাও হতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, ‘সীমিত সংঘাত’ ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যুদ্ধের নিজস্ব গতি: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তাকেয়েহ সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে তার গতিপথ আগে থেকে নির্ধারণ করা যায় না। ভিয়েতনাম যুগের সতর্কবার্তার উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন, ‘বাঘের পিঠে উঠলে কখন নামবেন, তা নিশ্চিত নয়।’ তার আশঙ্কা, ইরান দুর্বল হলেও পাল্টা হামলায় মার্কিন সেনা হতাহত হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় আঘাতে যেতে বাধ্য হতে পারে; এতে প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধের চক্র শুরু হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়াবে যুদ্ধ।
সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু