ব্যয়ের পাহাড়, ফল শূন্য
রাজধানী ঢাকায় মশা এক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। কল্যাণপুর থেকে উত্তরা, কামরাঙ্গীরচর থেকে যাত্রাবাড়ী—পুরো শহরই এখন মশার দখলে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাসেল জনির মতো অসংখ্য মানুষ দিনের বেলাতেও মশার কয়েল জ্বালিয়ে ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় বাইরে দাঁড়ানোই দুঃসহ হয়ে উঠছে। নগরবাসীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক গবেষণা একই কথা বলছে। ঢাকায় মশার উপদ্রব এখন আর সাধারণ সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করেছে। জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঘণ্টায় পাঁচটি মশার কামড় উদ্বেগজনক ধরা হলেও ঢাকায় তা পৌঁছেছে প্রায় ৮৫০-এ। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির, যা নর্দমা ও দূষিত পানিতে জন্মায় এবং ফাইলেরিয়া বা জাপানি এনসেফালাইটিসের মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। সামনে তাপমাত্রা বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও ফল শূন্যের কাছাকাছি। গত এক দশকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে প্রায় ১ হাজার ১২ কোটি টাকা। অথচ বাস্তবতা হলো, নগরবাসী এখনো কয়েল, অ্যারোসল ও মশারিনির্ভর ব্যক্তিগত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বৈপরীত্য প্রশ্ন তোলে, সমস্যা কি অর্থের অভাবে, নাকি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায়? সমস্যার মূল কারণগুলো এখন মোটামুটি পরিষ্কার। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিষ্কার ড্রেন ও খাল, স্থগিত উন্নয়নকাজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। অনেক এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন সংস্কার মাসের পর মাস ঝুলে থাকায় জমে থাকা পানি মশার বংশবিস্তার বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ও জনপ্রতিনিধিহীনতা। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেই বোঝা যায়, বাস্তব সমস্যার চেয়ে কাঠামোগত জটিলতাই বড় বাধা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। সিটি করপোরেশন একদিকে নাগরিক সচেতনতার কথা বলছে, অন্যদিকে নাগরিকরা অভিযোগ করছেন নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব নিয়ে। বাস্তবতা হলো, মশা নিয়ন্ত্রণ একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম, যা শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমাধান করা যায় না। এতে প্রয়োজন টেকসই নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। আইনি নোটিশের ঘটনাও দেখাচ্ছে যে, বিষয়টি এখন নাগরিক অধিকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগে মৃত্যু বাড়ার প্রেক্ষাপটে নাগরিকরা এটিকে মৌলিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। এ অবস্থায় কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। ঢাকা একটি বিশ্বমানের মহানগর হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু যেখানে মানুষ দিনের বেলায় কয়েল জ্বালিয়ে বাঁচতে চায়, সেখানে উন্নয়নের ভাষণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। মশা নিধন কোনো তুচ্ছ সেবা নয়; এটি নাগরিক মর্যাদা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং কার্যকর নগর শাসনের সূচক। এখনই সমন্বিত, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ না নিলে ঢাকার এই নীরব দুর্যোগ আরও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু