আফগানিস্তানে সিরিজ বিমান হামলা পাকিস্তানের
যুদ্ধাবস্থায় দুই দেশ
কালবেলা ডেস্ক 8 আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এখন কার্যত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। আফগান তালেবান বাহিনী সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক পোস্টগুলোতে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর পর পাকিস্তানও কঠোর জবাব দিয়েছে। শুক্রবার ভোরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পক্তিকা প্রদেশে সিরিজ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এই পরিস্থিতিকে ‘সরাসরি যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন তোমাদের ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো।’ তিনি জানান, কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিও এই প্রতিক্রিয়াকে ‘চূড়ান্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ‘পাকিস্তানবিরোধী সন্ত্রাসীদের’ আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি ইসলামাবাদের একটি মসজিদে হামলার জন্যও তারা আফগান ভূখণ্ডকে দায়ী করে। তবে তালেবান সরকার এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে বলেছে, তাদের মাটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। গত অক্টোবর মাসে দুই দেশ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত উত্তেজনা বেড়েই চলছিল। তবে বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। তালেবান সরকার সীমান্ত জেলাগুলোতে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানও তার বিমান শক্তি ব্যবহার করে কাবুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে বোমাবর্ষণ করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী যে কোনো আগ্রাসন ‘গুঁড়িয়ে দিতে’ সক্ষম। অন্যদিকে, তালেবান যোদ্ধারাও ড্রোনের মাধ্যমে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে দুই দেশের সীমান্তে এখন কামানের গর্জন আর যুদ্ধবিমানের আনাগোনা এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, এবারের হামলাটি ভিন্ন। কারণ এবার পাকিস্তান কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, সরাসরি তালেবান সরকারের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তালেবান সামরিক প্রধান কারি মুহাম্মদ ফাসিহউদ্দিন ভবিষ্যতে আরও ‘নির্ণায়ক’ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে দুই দেশ এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। রাতভর পাল্টাপাল্টি হামলা: ঘটনার সূত্রপাত হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে। ওই সময় আফগান তালেবান কর্মকর্তারা নানগারহার, নুরিস্তান, কুনার, খোস্ত, পাক্তিয়া ও পাক্তিকা সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে একটি বড় ধরনের অভিযান শুরু করার কথা জানান। পাকিস্তানের দাবি, তালেবানরা ‘ভুল হিসাব’ কষে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের একাধিক স্থানে বিনা উসকানিতে গুলি চালিয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান পাল্টা আঘাত হানে। শুক্রবার ভোররাতে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে বোমা হামলা চালায়। কাবুল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাত ১টা ৫০ মিনিটে প্রথম দফা এবং তার কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়। আফগান বিমানবিধ্বংসী কামানগুলো থেকে পাল্টা গুলি চালিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও পাকিস্তানের বিমান হামলা ছিল অত্যন্ত জোরালো। ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি: ব্যাপক সংঘাতে জড়ানোর পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই নিজ নিজ সাফল্যের দাবি করা হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা আফগানিস্তানজুড়ে অন্তত ২২টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং ৭৩টি চৌকি ধ্বংস করেছেন। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, তাদের হামলায় অন্তত ২৭৪ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং ১৮টি চৌকি তারা দখল করে নিয়েছেন। এ ছাড়া ১১৫টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করার দাবিও করেছে ইসলামাবাদ। এই লড়াইয়ে ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, পাকিস্তানের হামলায় ১৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, জালালাবাদে একজন কৃষকের বাড়িতে এবং পক্তিকার একটি ধর্মীয় মাদ্রাসায় পাকিস্তান বোমা হামলা চালিয়েছে, যাতে নারী ও শিশুসহ বেশ কিছু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। তালেবানের দাবি, তাদের পাল্টা হামলায় ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং তারা বেশ কিছু সেনাকে জীবিত বন্দি করেছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তালেবান কর্তৃক পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ড্রোন হামলা। তালেবান সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, তারা আফগানিস্তান থেকে ড্রোন পাঠিয়ে পাকিস্তানের নওশেরা, অ্যাবোটাবাদ ও সোয়াবিতে আক্রমণ করেছে। যদিও পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা সবকটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমান্তের এত গভীরে তালেবানের ড্রোন পৌঁছানো একটি নতুন ও উদ্বেগের বিষয়। সাধারণত বাণিজ্যিক ড্রোনে আইইডি ব্যবহার করে তালেবানরা এই আক্রমণগুলো পরিচালনা করছে। বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া: পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ইরান ও চীন উভয়পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রমজান মাসের পবিত্রতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু