বেইমান জন্মেছিল মানুষের সাথেই, প্রথম প্রতিশ্রুতির আগেই তার ছায়া। বিশ্বাসের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও সে নীরবে শিখেছে ভাঙার কৌশল।
একদিন শপথ ছিল অগ্নির মতো, আজ তা কুয়াশা, স্পর্শে মিলিয়ে যায়। মঞ্চে উচ্চারণ করা শব্দগুলো পথে নামলেই বদলে ফেলে রঙ।
জুলাইয়ের সেই সনদের পাতায় যে অক্ষরগুলো কাঁপছিল আশায়, সেগুলো কি এখনো বেঁচে আছে, নাকি ইতিহাসের ধুলায় চাপা?
ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বৃষ্টি, ভোটের পরে শুষ্ক মরুভূমি। যে হাত ধরেছিল মানুষের, সে হাতই কি আজ দূরে সরে যায়?
কবি মৃধা আলাউদ্দিনের জন্মদিন ও কাব্যসন্ধ্যা
চব্বিশের সেই গণঅভ্যুত্থানের আগুনে যারা পথ খুলে দিয়েছিল প্রত্যাবর্তনের, যারা রক্তে লিখেছিল ফিরে আসার অধিকার, তাদের প্রতিই যদি ফিরিয়ে দাও অবহেলা, তাদের স্বপ্নেই যদি বসাও অবিশ্বাসের ছুরি, তবে এ শুধু বেইমানি নয়, এ ভবিষ্যতের জন্য এক কঠিন শিক্ষা।
মানুষ একবার প্রতারিত হলে দ্বিতীয়বার আর কাঁধ বাড়ায় না। বিপদের দিনে যে ফিরে তাকায় না, তার জন্য বিপদের সময়ও কেউ দাঁড়ায় না।
স্মরণ রেখো, সময়ের কাছে সব হিসাব জমা থাকে। যদি সেই আগুনের ঋণ অস্বীকার করো, তবে একদিন চারদিক ভরে যাবে নীরবতায়। ডাক দেবে, কেউ সাড়া দেবে না। তখন ক্ষমতা থাকবে, পতাকা থাকবে, কিন্তু পাশে থাকবে না মানুষ।
আর মানুষহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত শুধুই একা এক শূন্যতা।
রাজনৈতিক পতাকার নিচে যারা স্লোগানে মুখর ছিল, অরাজনৈতিক ব্যানারে যারা নৈতিকতার আলো জ্বালিয়েছিল, সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা যারা স্বপ্ন এঁকেছিল রাস্তায় রাস্তায়, সাংস্কৃতিক মঞ্চের শিল্পীরা যারা কণ্ঠে তুলেছিল প্রতিবাদের সুর, সবাই কি একদিন একই প্রশ্নে দাঁড়ায় না?
কোথায় গেল সেই অঙ্গীকার, কোথায় গেল সেই প্রতিজ্ঞা? ক্ষমতার চৌকাঠ পেরোলেই কেন বদলে যায় উচ্চারণের মানে?
বেইমানি শুধু ব্যক্তি নয়, এ এক অভ্যাস, এক প্রথা, যা সময়ের সাথে রূপ বদলায়, কিন্তু মর্মে থেকে যায় একই।
আর শেষে প্রশ্নটা ফিরে আসে আমাদের নিজের দিকে।
কে বেইমান নয়? সাধারণ জনগণ কি বলতে পারে তার হাতে কোনো ফাঁকি নেই? ক্রেতা কি পারে বলতে কখনো সে মাপে কম নেয়নি? বিক্রেতা কি শপথ করবে দামে কখনো বাড়তি রাখেনি? প্রশাসন কি বুকের ওপর হাত রেখে বলবে তার কলম ছিল সম্পূর্ণ নির্মল? শিক্ষক কি বলতে পারবেন তার বিবেকে ছিল না কোনো আপস?
আমরা কি কেউ পারি নির্ভয়ে উচ্চারণ করতে আমি বেইমান নই?
যে অন্যায়ে চুপ থেকেছি, যে সত্য জানতাম তবু বলিনি, যে সুবিধার জন্য নীরব থেকেছি, সেই নীরবতাও কি এক ধরনের বেইমানি নয়?
ওই যে বলেছিলাম, বেইমান শুধু বাইরে নয়, সে নিত্যদিনের সাথী। সে আমার ভেতরে, আমার সুবিধা, আমার ভয়, আমার আপসের নাম।
বেইমান সেতো আমারই আরেক মুখ, যাকে আয়নায় দেখলে আমি নিজেই চমকে উঠি।
তাই বিচার শুরুর আগে আঙুল তোলার আগে একবার বুকের ভেতর তাকাই।
হয়তো সেদিন বেইমানির গল্প বদলাবে, যেদিন আমরা স্বীকার করব বেইমান সেতো অন্য কেউ নয়, বেইমান সেতো আমার আমি।
