শিরোনাম
Ad Image

বাংলা ভাষার বিকাশে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রয়োজন

বাংলা ভাষার বিকাশে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রয়োজন

বাংলা ভাষার বিকাশে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রয়োজন

আকমল হোসেন

ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের বিভিন্নমুখী চাহিদা মেটানো এবং সামাজিকতার জন্য যোগাযোগের প্রয়োজন আর এ কাজটি সম্পন্ন করতে ভাষার প্রয়োজন। মানুষের প্রয়োজন থেকে ভাষার সৃষ্টি। যোগাযোগের জন্য প্রাণীদের মধ্যেও ভাষার ব্যবহার হয়। তবে সেটা লেখ্য নয়, কথ্য ভাষায়। ভাষার প্রাণ না থাকলেও সৃজনী শক্তি আছে। সে কারণেই পৃথিবীর দেশে দেশে নানান ধরনের ভাষার দেখা পাওয়া যায়। ভাষার নিজের চলার ক্ষমতা নেই, মানুষ তাকে চালায়, তাদের প্রয়োজনে। মানুষের চালানোর ওপরই ভাষার সৃজনী শক্তি বিকশিত হওয়া নির্ভর করে। আর গুরুত্ব পায় একটি জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর প্রশাসনিক শক্তির কারণে। ভাষার নানাবিধ চর্চা তাকে বিকশিত করে সমৃদ্ধ করে এবং মানুষের নিকট গ্রহণীয় করে তোলে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। আবার শাসক শোষক ও স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্তেও অনেক ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে। সুলতানি আমলের শেষ সুলতান ইব্রাহীম লোদীকে প্রথম পানি পথের যুদ্ধে পরাজিত করে ১৫২৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। তাদের সময় রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পায় ফারসি, আরবি ও তুর্কি ভাষা। একসময় সংস্কৃত ভাষায় লেখা মহাভারত ও রাজত বাসিনী ফারসি ভাষায় ভাষান্তর করা হয়। এর পূর্বে (১২০৬-১৫২৬) সুলতানি আমলে শাসক ও শাসন কাজের ভাষা ছিল ফারসি। তবে আরবি ভাষাও ছিল। ১৫৫৬ সালে পিতা হুমায়ুনের মৃত্যুর পর বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে সিংহাসনে বসেন সম্রাট আকবর। তিনি কর আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা নববর্ষ পালনের আয়োজন করেন। আলবেরুনীসহ অনেক মুসলিম মনীষী সংস্কৃত ভাষা থেকে আরবিতে অনেক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় সাহিত্য চর্চা করেছিলেন। শাসক নুসরত শাহের আমলে মহাভারতকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন কৃত্তিবাস। অনেক হিন্দু সুলতানের সুনজরে থাকা এবং রাজকর্মচারী হওয়ার জন্য আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন, যেমনটি ব্রিটিশ আমলে ভারতীয়দের শিখতে হয়েছিল ইংরেজি। সংখ্যার বিচারে বাংলার অবস্থান ৪ নম্বরে। তবে সংখ্যার চেয়ে শিক্ষা সংস্কৃতি অর্থনীতি ও জীবনবোধে বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় দাঁড়ানোর জায়গায় থেকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখতে পারলেই ভাষার টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়বে। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ, যা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নামক জনৈক ব্যক্তি নেপালের রাজ দরবার থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮-১৫৩৮) ইলিয়াস শাহকে মধ্যযুগে মুসলিম বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক বলা হয়। তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের সমন্বয়ে দুই ভূখণ্ডকে একত্রিত করে বৃহত্তর বাংলার সৃষ্টি করেছিলেন। তার আমলে বাঙালিরা সর্বপ্রথম একটি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বঙ্গের বাইরের লোকেরা বাঙালি বলে পরিচিতি পায়। গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের আমলে (১৩৯৩-১৪০০) প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন। নসরত শাহের আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তার আমলেই মহাভারত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয়। কবি আফজাল আলী বাংলা ভাষায় তার নসিহত নামা রচনা করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে দৌলত উজির এবং বাহারাম খান বাংলা ভাষায় লায়লী মজনু রচনা করেন। বাঙালি মুসলিম কবিদের পাশাপাশি হিন্দু কবিদেরও বাংলা চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কবি কৃত্তিবাস ওঝা বাংলা ভাষায় রামায়ণ অনুবাদ করেন। এ সময় অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার পরাজয় এবং ১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লাভ, খ্রিষ্টান মিশনারি কর্তৃক শিক্ষার মাধ্যমে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার, কোম্পানির ব্যবসা ও ক্ষমতা সুসংহত করার চিন্তা থেকে এ দেশে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুপারিশ করা হয়। এখান থেকেই ভাষাগত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। ব্রিটিশ শাসনামলে লর্ড বেন্টিক মেকলে কর্তৃক ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুপারিশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ইংরেজি ভাষা ইউরোপের অন্য ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তৎকালীন সময়ে আরবি ও ফারসির আধিপত্যের কারণে তিনি মন্তব্য করেন, বিদেশি ভাষায় যদি তাদের কাজ করতেই হয়, তবে ইংরেজিতে করাই উচিত এবং ভারতীয়রা ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতেও আগ্রহী। অন্য ভাষার প্রতি অবজ্ঞা করে মন্তব্য করেন, ভারতবর্ষ ও আরবের সমগ্র সাহিত্য ইউরোপের কোনো একটি ভালো গ্রন্থাগারের সংগৃহীত মাত্র একটি সেলফে রাখা পুস্তকাবলির পাশে সমমর্যাদায় দাঁড়াতে পারে না। একই সুরে ওই সময়ে সংস্কৃত ভাষার তথাকথিত পণ্ডিতরা বাংলা ভাষা নিয়ে অবজ্ঞা করে বলেছিল, বাংলা আবার ভাষা নাকি? ওটি তো পাখির ভাষার মতো কিচিরমিচির শব্দ। একই সুরে পশ্চিমা সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠী বলেছিল, বাংলা হিন্দুয়ানি ভাষা, মুসলমানের ভাষা হবে আরবি ও উর্দু। এটা বলার মধ্য দিয়েই তাদের বাংলা ভাষা বিরোধী ষড়যন্ত্র শুরু হলো। বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন দমন করতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ দিয়ে গুলি করে হত্যা করল সালাম, বরকত, শফিক, রফিক, জব্বারকে। শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার স্থাপনে বাধা দেওয়া হলো, তাদের অনুসারীরা স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ওই শহীদ মিনার ভেঙে দিয়েছে, মাঝেমধ্যেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়া শরিয়তে জায়েজ কী জায়েজ নয়, সেই ফতোয়া দিতে দেখা যায়। ভারতের আসামের শিলচরে ১৯৬১ সালে বাংলা ভাষার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সেখানেও ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভারতের আসামে তখন ক্ষমতাসীন ছিল ভারতীয় কংগ্রেস। শাসক ও সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে অন্য জাতি ও সম্প্রদায়ের ওপর ভাষা ও সংস্কৃতিগত আগ্রাসন চালিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেলেও ব্যবহারিক দিকে তার দৈন্যদশা কাটেনি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। ভাষার সংগ্রামের প্রেরণায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শোষণ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর ধর্মীয় নিষ্পেষণের জাঁতাকল থেকে বাঙালি মুক্তির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে। সেই যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষকে জীবন দান এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনকে সম্ভ্রম দেওয়ার মাধ্যমে পাওয়া স্বাধীনতা একং বাঙালিদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেন। বাংলায় ছাপানো দুই টাকার নোট (জাতীয় পাখি দোয়েলের ছবিসংবলিত) শ্রেষ্ঠ নোটের মর্যাদা লাভ করেছে। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের মর্যাদা লাভ বাংলা ভাষার সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। এরপরও বাংলা ব্যবহারিক জীবনে উপেক্ষিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান, গবেষণা, ব্যাংক হিসাব খোলার ৮ পাতা এবং ঋণ গ্রহণের জন্য ২৭ পাতার ইংরেজি ফরমের ফিরিস্তি এখনো বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসে আছে। দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্বায়নের জোয়ার বইছে; কিন্তু অনুবাদ শিল্প আগায়নি। এমফিল পিএইচডি ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু বাংলার অবস্থান কমছে। পারিবারিক অনুষ্ঠান বিবাহ, খতনার দাওয়াতপত্রও লেখা হচ্ছে অন্য ভাষায়। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ লুটপাটের মাধ্যমে কিছু মানুষের হাতে কাঁচা টাকা আসায় কি ছিনু আর কি হনু এই অহমিকায় বাংলা ছেড়েছে তারা। পোশাক-আশাকে বাংলা সংস্কৃতির অনুপস্থিতি দিনদিন বাড়ছে। বাংলা শেখার আগেই ইংরেজির পেছনে ঘুরছে, ছেলে মেয়েদেরও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার আয়োজন চলছে। নিজে যেটি করতে পারেনি সন্তানদের দ্বারা সেটি করার সর্বশেষ চেষ্টা চলছে। উঠতি বয়সের এক শ্রেণির মানুষের বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণ ঘটিয়ে কি যে বলছে, যেটি না হচ্ছে বাংলা না হচ্ছে ইংরেজি, যেটি হাল-ফ্যাশানের উলঙ্গবাহার পোশাকের মতো। এসবের ফল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে মিনিমাম পাস নম্বরও না পাওয়ার ঘটনা দেখলেও বোঝা যায়। ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভাষা ছেড়ে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে পড়েনি। ১৯৫২ সালে জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের শাসক ১২ বছরব্যাপী সবার জন্য এলিমেন্টারি শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলেও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষা চালুর বিধান করেছে। শাসকদের জনবিমুখ রাজনৈতিক নীতি জাতির জন্য নানান দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের বিপক্ষে পরিচালিত হলে জনতার কিছুই করার থাকে না। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য, সেটা থেকে রক্ষা পাওয়া জনগণের জন্য খুবই কঠিন। মা মাটি মাতৃভাষা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা অনুধাবন করে বিশ্বায়নের সঙ্গে টিকে থাকতে বাংলা ভাষাকে বিকশিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও দেশপ্রেম। লেখক: কলেজ অধ্যক্ষ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু

আপনার মতামত লিখুন
Ad Image
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর