শিরোনাম
Ad Image

শিশুপ্রহরের উচ্ছ্বাসে মুখর প্রাঙ্গণ

শিশুপ্রহরের উচ্ছ্বাসে মুখর প্রাঙ্গণ

শিশুপ্রহরের উচ্ছ্বাসে মুখর প্রাঙ্গণ

: শেষ পৃষ্ঠার পর ভালোবাসুক। এখানে এসে মনে হচ্ছে আমি সত্যি একটি বড় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি।’ আরেক শিশু প্রথম শ্রেণির সায়মা একটু লাজুক গলায় বলে, ‘আমি নদী আর নৌকা এঁকেছি। আমাদের গ্রামে নৌকা আছে। আমি চাই আমার গ্রামটাও ছবির মতো সুন্দর থাকুক।’ চিত্রাঙ্কনের পর মঞ্চে শুরু হয় পাপেট শো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু চত্বরে তখন আয়োজন করেছে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার। মঞ্চে শুরু হয় পুতুল নাচ। রঙিন পোশাকে সাজানো পাপেটদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি মুহূর্তেই টেনে নেয় শিশুদের মনোযোগ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। ঠিক দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, শতাধিক শিশু আর তাদের অভিভাবক গোল হয়ে বসে মন দিয়ে দেখছে অনুষ্ঠান। কেউ মাটিতে বসে, কেউবা মায়ের কোলে, কেউ আবার বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। মঞ্চে হাজির হয় দুই পুতুল বন্ধু অপু ও দিপু। তারা গল্প বলে, মজা করে, আবার গল্পের ভাঁজে ভাঁজে দিয়ে যায় ছোট ছোট শিক্ষণীয় বার্তা। কখনো পরিচ্ছন্নতা নিয়ে, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার কথা, কখনো বা বড়দের কথা শোনার গুরুত্ব। শিশুদের হাসি আর হাততালিতে বারবার থেমে যায় তাদের সংলাপ। অপু যখন ভুল করে, দিপু তাকে ঠিক করে দেয়। আর সেই ছোট্ট ভুল-শুদ্ধির খেলায় শিশুদের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের আলো। অপু-দিপু বিদায় নিতেই হঠাৎ বেজে ওঠে এক পরিচিত সুর—‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে…’। গানের প্রথম লাইনেই শিশুরা সুর মিলিয়ে গাইতে শুরু করে। ঠিক তখনই মঞ্চের পেছন থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে বিশাল এক বাঘ পুতুল। লেজ নেড়ে, মাথা দুলিয়ে তালে তালে নাচতে নাচতে সে সামনে আসে। বাঘটাকে দেখে কেউ বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, কেউবা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। তারপর যা হলো, তা যেন এক মুহূর্তের উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। বাঘ নেমে এলো মঞ্চ থেকে সোজা শিশুদের মাঝে। সামনের সারির কয়েকজন শিশু একটু ভয় পেয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরলেও পরক্ষণেই বুঝে যায়, এ তো তাদেরই প্রিয় বাঘ মামা। হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে চায় সবাই। কেউ লেজ ধরে টানতে চায়, কেউ তার বড় থাবায় হাত রাখে। চারপাশ ভরে ওঠে হাসি, হাততালি আর ক্যামেরার ক্লিক শব্দে। আরাত্রিকা তখন বাঘের একেবারে কাছাকাছি। সে দাঁত বের করে হাসছে, আর মাকে বলছে, ‘আরেকটা ছবি তোলো!’ তার মতো আরও অনেক শিশু এই বাঘ মামার সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত। কারও মুখে বিস্ময়, কারও চোখে নিখাদ আনন্দ। অভিভাবকরাও যেন এই মুহূর্তে শিশু হয়ে যান। তারা সন্তানদের হাসি দেখেই তৃপ্ত হন, মোবাইল ফোনে ধরে রাখেন এই ছোট্ট স্মৃতি। শিশুচত্বরে সেই সময়টুকু ছিল একেবারে অন্যরকম। বইমেলার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর লেখক-পাঠকের ভিড়ের বাইরে এখানে ছিল নিখাদ আনন্দের এক ভুবন। পাপেট শোর এই আয়োজন শুধু বিনোদনই নয়, শিশুদের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেওয়ার এক সুন্দর প্রয়াস। বাবার কোলে বসা ছোট্ট ইরাবতি অনুষ্ঠান শেষে বলে, ‘বাঘটা যখন নাচছিল, আমার একটুও ভয় লাগেনি। ও খুব মজার ছিল। ও আবার আসবে তো? আমি আবার দেখতে চাই।’ ইরাবতির বাবা মৃণাল বন্দ্যে বলেন, ‘শিশুরা গল্প আর পাপেট খুব পছন্দ করে। এখানে শুধু বিনোদন নয়, শেখার বিষয়ও আছে। আমি দেখলাম, গল্পের মধ্য দিয়ে ওদের ভালো কথা শেখানো হচ্ছে। এমন আয়োজন নিয়মিত হলে শিশুরা বইয়ের সঙ্গে আরও যুক্ত হবে।’ গতবারের মতো এবারও বইমেলায় নেই সিসিমপুরের জনপ্রিয় চরিত্রগুলো। প্রতিবার সিসিমপুরের চরিত্র হালুম, শিকু, ইকরি, টুকটুকি মাতিয়ে রাখে শিশুদের। কিন্তু এবার তাদের অনুপস্থিতি শিশুদের আহত করেছে অনেকটাই। যদিও অন্য পাপেট শো কিছুটা মন ভুলিয়েছে শিশুদের। শিশুপ্রহর ঘিরে বেশ কয়েকজন অভিভাবক সন্তোষ প্রকাশ করলেও কিছু পরিবর্তন নিয়ে মতামত দেন। অভিভাবক শফিক ইসলাম বলেন, ‘শিশুদের নিয়ে বইমেলায় আসার আলাদা একটা আনন্দ আছে। আগের বছরগুলোতে আলাদা শিশুচত্বর থাকত, সিসিমপুরের চরিত্ররা থাকত। এবার সেটা নেই, তাই একটু খালি খালি লাগছে। তবে চিত্রাঙ্কন আর পাপেট শোর আয়োজনটা ভালো হয়েছে। অন্তত শিশুরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারছে।’ বিউটি দাস নামে এক মা বলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলে বইয়ের প্রতি আগ্রহী হোক। মোবাইল আর টেলিভিশনের বাইরে বইয়ের একটা জগৎ আছে, সেটা যেন সে ছোটবেলা থেকেই চিনতে পারে। আজকে সে নিজে একটা গল্পের বই পছন্দ করেছে। এটা আমার কাছে বড় প্রাপ্তি।’ আরেকজন অভিভাবক রাশেদুল করিম বলেন, ‘মেলা মাত্র ১৮ দিনের, তার ওপর রমজান মাস চলছে। তারপরও শিশুপ্রহরের আয়োজন রাখা হয়েছে, এটা ইতিবাচক। তবে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট একটি বড় পরিসর থাকলে ভালো হতো। ভবিষ্যতে আয়োজকরা বিষয়টি ভাববেন বলে আশা করি।’ শিশুপ্রহর শেষে অনেক শিশুকে দেখা যায় বইয়ের স্টলে ভিড় করতে। কেউ ছবি দেখে বই বেছে নিচ্ছে, কেউ ছড়ার বই উল্টে দেখছে। নতুন বইয়ের গন্ধ, রঙিন প্রচ্ছদ আর খোলা আকাশের নিচে বই হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের দৃশ্য মেলার আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করে। প্রকাশকরা জানান, প্রথমদিকে কিছু স্টলের কাজ শেষ না হলেও ছুটির দিনে শিশু ও পরিবারভিত্তিক উপস্থিতি বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রমজান মাস ও স্বল্প সময়সীমা নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। অ্যাডর্ন প্রকাশনীর প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, আজ বইমেলায় এত বিপুলসংখ্যক পাঠক উপস্থিত হবেন, তা তিনি শুরুতে কল্পনাও করেননি। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পাঠক সমাগম দেখে তিনি আনন্দিত। তার ভাষায়, মেলায় যে সাড়া মিলছে, তা প্রকাশকদের জন্য ভীষণ উৎসাহব্যঞ্জক। আগামী দিনগুলোতে পাঠকের উপস্থিতি আরও বাড়বে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এবারের মেলায় অংশ নিয়েছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি স্টল রয়েছে। মোট ইউনিট ১ হাজার ১৮টি। গত বছর অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান; সে তুলনায় এ বছর অংশগ্রহণ কমেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায় করা হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর, যেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিন স্টল পেয়েছে। শিশুচত্বরে রয়েছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ও ১০৭টি ইউনিট। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সেমিনার এবং ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে ‘শিশুপ্রহর’। মেলা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে; ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে শুরু হবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন না। মেলার সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পুরো প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। মেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এবারের বইমেলার ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসেবে রয়েছে বর্তমান বাংলা লিমিটেড।

সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু

আপনার মতামত লিখুন
Ad Image
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর