শিরোনাম
Ad Image

নাজির আফজাল মুসলিমবিদ্বেষ ও সহাবস্থানের বাস্তবতা

নাজির আফজাল মুসলিমবিদ্বেষ ও সহাবস্থানের বাস্তবতা

নাজির আফজাল

মুসলিমবিদ্বেষ ও সহাবস্থানের বাস্তবতা

এই রমজানে আমাদের লাখ লাখ মানুষ ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীরবে রোজা রাখবেন। আমরা প্রতিবেশীদের খাবার দেব। আমরা দান করব, অন্য যে কোনো গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। আমরা এমন একটি দেশের জন্য প্রার্থনা করব, যাকে আমরা গভীরভাবে ভালোবাসি

রমজান মাসে ব্রিটেনের মুসলমানরা রোজা রাখেন এবং আত্মসমালোচনা ও দানের প্রস্তুতি নেন। বছরের এ সময়টি আমাদের অধিকাংশের জন্য আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা, সংযম ও উদারতার এক বিশেষ অধ্যায়। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সংযমের বিষয় নয়, এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা এবং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার সময়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের অনেকের জন্য এ মাসটি এমন এক সময়ও হয়ে দাঁড়ায়, যখন মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের সুর আরও জোরালো হয়ে ওঠে, সন্দেহের চোখ আরও তীক্ষ্ণ হয় এবং সামাজিক উত্তেজনা যেন বাড়তি মাত্রা পায়। আমি কখনোই ইসলামোফোবিয়া শব্দটি পছন্দ করিনি। শব্দটি খুব বিমূর্ত শোনায়, যেন এটি কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা। এতে যেন এক ধরনের অস্পষ্ট ভয়ের ধারণা আছে। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আমরা কোনো অজ্ঞাত আতঙ্কের মুখোমুখি নই। আমরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি তা স্পষ্ট ও কঠিন। এটি বৈরিতা। এটি সন্দেহ। এটি বৈষম্য। এটি প্রকাশ্য কিংবা আড়াল করা নির্যাতন। তাই আমি একে তার প্রকৃত নামেই ডাকি, মুসলিমবিদ্বেষ। আমাদের জাতীয় জীবনে এমন একটি দিনও যায় না, যখন এর কোনো না কোনো প্রকাশ আমরা দেখি না। একজন মুসলমান কোনো অপরাধ করলে সেটিকে প্রায়ই সব মুসলমানের বিরুদ্ধে অভিযোগে রূপান্তর করা হয়। একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চাকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমনভাবে তুলে ধরা হয়, যেন সেটি সমাজের জন্য হুমকি। ধর্মীয় কোনো ধারণাকে বিকৃত করে আতঙ্ক তৈরির অস্ত্র বানানো হয়। আর রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মনোভাব কখনো সহিংসতা, কখনো ভয়ভীতি, কখনো বর্জনের রূপ নেয়। লক্ষ্যবস্তু হয় যে কেউ, যাকে দেখতে মুসলমান মনে হয় বা যার নাম মুসলিম শোনায়। এই দ্বৈত বাস্তবতার অভিজ্ঞতা আমি নিজে বহন করেছি। কেউ আমাকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম চ্যান্সেলর বলে না। কেউ আমাকে চার্চ অব ইংল্যান্ডের সুরক্ষা প্যানেলের মুসলিম চেয়ার হিসেবে উল্লেখ করে না। যখন আমি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ার হিসেবে কাজ করি তখনো আমার ধর্মকে খুব কমই প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়। সেখানে আমার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বই মুখ্য। কিন্তু যখন আমি উত্তরপশ্চিম ইংল্যান্ডের প্রধান প্রসিকিউটর ছিলাম, তখন হঠাৎ করেই আমার পরিচয়ের সামনে মুসলমান শব্দটি জুড়ে গেল। আমি যখন গ্রুমিং গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম এবং যেখানে অন্যরা ব্যর্থ হয়েছিল সেখানে বিচার নিশ্চিত করলাম, তখন আমাকে মুসলিম সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই মুসলিম প্রসিকিউটর হিসেবে, যে মুসলমানদের বিচার করে। উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো যখন আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তখন আমার পেশাগত সাফল্য, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কিংবা ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের কোনো মূল্য থাকেনি। আমার ধর্মই হয়ে উঠেছিল আমার প্রধান পরিচয়। আমি প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি, নাগরিক নেতৃত্বে সফল হলে আমার বিশ্বাস কেন গৌণ হয়ে যায়, অথচ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করলে সেটাই কেন কেন্দ্রে চলে আসে। মুসলমানরা সমাজে অবদান রাখলে কেন তা অদৃশ্য থেকে যায়, আর অভিযুক্ত হলে কেন সেটিই বড় করে দেখা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার প্রতিফলন। ব্রিটেনের মুসলমানরা প্রতিদিন অর্থনীতি, জনসেবা, শিল্পকলা ও সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমরা চিকিৎসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সৈনিক, সরকারি কর্মকর্তা, সেবাকর্মী। আমরা ব্যবসা গড়ে তুলছি, গবেষণা করছি, শিল্প সৃষ্টি করছি, সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। তবুও এখনো এমন এক প্রবণতা আছে যেখানে আমাদের প্রথমেই ‘অন্য’ হিসেবে দেখা হয়। যেন আমাদের অবদান স্বাভাবিক নয়, ব্যতিক্রম। এ কথা স্বীকার করা জরুরি যে, মুসলিম সমাজের সব চ্যালেঞ্জ কল্পিত নয়। উগ্রবাদ রয়েছে। কিছু অঞ্চলে একীভূত হওয়ার সমস্যা আছে। কারাগারে মুসলমানদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। মুসলিম সমাজ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্য সংস্কৃতি, ভাষা, অভ্যাস ও সামাজিক বাস্তবতার জটিলতা তৈরি করে। এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যার মুখোমুখি হওয়া কোনো উগ্রপন্থিদের জন্য উপহার নয়। এটি আমাদের নিজেদের প্রতি দায়িত্ব। বিদ্বেষীরা ঘৃণা করার জন্য প্রমাণ খোঁজে না। তারা শুধু একটি লক্ষ্য খোঁজে। নীরবতা আমাদের রক্ষা করে না; বরং এটি সমস্যাকে অমীমাংসিত রেখে দেয় এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের পথ তৈরি করে। তবুও যা আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে, তা হলো সমষ্টিগত দোষারোপের অযৌক্তিকতা। কয়েকজনের আচরণের দায় পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। ব্যক্তির অপরাধকে ধর্মের অপরাধে রূপান্তর করা যুক্তিহীন ও বিপজ্জনক। কোনো মুসলমান নাম ধারণ করলেই তার কাজ ধর্মীয় হয়ে যায় না। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা সত্যের বিকৃতি। এ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রাখে। আমরা কি মানুষকে তার কাজ, চরিত্র ও অবদানের ভিত্তিতে বিচার করব, নাকি তার পরিচয়ের ভিত্তিতে। আমরা কি নাগরিকত্বকে বহুত্বের ভিত্তিতে গড়ে তুলব, নাকি সংকীর্ণ ধারণায় সীমাবদ্ধ রাখব। রমজান আমাদের শেখায় আত্মসমালোচনা, সংযম ও সহমর্মিতা। এটি কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমাজের জন্যও একটি সুযোগ। এই সময়ে আমাদের উচিত নিজেদের ভেতরে তাকানো এবং প্রশ্ন করা, আমরা কি একে অন্যকে ন্যায্যভাবে দেখছি। আমরা কি ভয়ের ভাষাকে সত্যের ভাষা হিসেবে মেনে নিচ্ছি, নাকি সহাবস্থানের পথে এগোচ্ছি। মুসলিমবিদ্বেষ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি বাস্তব মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। এটি আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করে, সুযোগ সীমিত করে, সামাজিক বিভাজন গভীর করে। এর মোকাবিলা করতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনও প্রয়োজন। প্রয়োজন ন্যায্যতা, প্রয়োজন সংলাপ, প্রয়োজন সাহস। সবশেষে প্রশ্নটি মুসলমান হওয়ার অর্থ কী, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে প্রস্তুত, যেখানে মানুষকে তার পূর্ণ পরিচয়ে, তার মানবিক মর্যাদায় দেখা হবে। যেখানে ধর্ম কোনো সন্দেহের চিহ্ন নয়; বরং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। যেখানে নাগরিকত্ব মানে সমান অধিকার, সমান দায়িত্ব এবং সমান সম্মান। কিছু মুসলমান কুকুর পছন্দ করেন না। কিন্তু আমি নয় বছর ধরে একটি কুকুর পালন করছি, আর সে আমার জীবনের এক আনন্দের উৎস। কোনো একজন মুসলমান যদি রোজার সময় অন্যদের তার সামনে না খেতে বলেন, তবে তিনি নিজের পক্ষেই কথা বলেন, ৩৯ লাখ ব্রিটিশ মুসলমানের পক্ষে নয়। কেউ যদি হালাল মাংসকে বড় কোনো পরিচয়গত বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন, তিনি আমার মতো একজন নিরামিষভোজীর প্রতিনিধিত্ব করেন না। আবার যখন সমালোচকরা হালাল প্রথাকে আলাদা করে নিষ্ঠুর বলে আক্রমণ করেন, তখন তারা সুবিধামতো এড়িয়ে যান যে, ব্রিটেনে অধিকাংশ হালাল মাংসই আগে অজ্ঞান করে জবাই করা হয়, যা হারাম মাংসের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। এরপর আসে তথাকথিত মুসলিম গ্রুমিং গ্যাং প্রসঙ্গ। আমি এমন বিচারিক প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছি, যেখানে শত শত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আমি ভুক্তভোগীদের পাশে বসেছি, তাদের কষ্ট কাছ থেকে দেখেছি। আমি প্রমাণ পর্যালোচনা করেছি গভীরভাবে। কিন্তু একবারও কোনো ধর্মীয় প্রেরণা দেখিনি। আমি যা দেখেছি, তা হলো কিছু পুরুষ দুর্বল ও অসহায় কিশোরীদের শোষণ করছে, আর এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, যারা সময়মতো তাদের কথা শোনেনি বা সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় তদন্তে আমি সাক্ষ্য দেব এবং তখন আরও বিস্তারিত বলব। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। কোনো অপরাধী মুসলমান নাম ধারণ করলেই তার অপরাধ ধর্মীয় হয়ে যায় না। অমানবিক কাজ কখনোই ধর্মীয় হয়ে ওঠে না, কেবল অপরাধীর পরিচয়ের কারণে। আমাদের আইনও সমান ভরসা দেয় না। আইনের চোখে মুসলমানরা কোনো জাতিগত গোষ্ঠী নয় বলে মুসলিমবিদ্বেষের শিকারদের ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ সংক্রান্ত আইনের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে মামলা প্রমাণের মানদণ্ড তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন। আমি একবার ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির এক আইনজীবীর মুখোমুখি বসেছিলাম। তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, তারা খুব ভালো করেই জানেন আইনের সীমারেখা কোথায় এবং প্রতিবারই সেই সীমার ঠিক কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ান। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই সীমারেখাকেও আরও অস্পষ্ট করে দিয়েছে। গোপন পরিচয়, বটের ব্যবহার এবং দুর্বল নজরদারির সুযোগে বিদ্বেষ যেন শিল্পোৎপাদনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এই শব্দের বন্যা একদিকে দুর্বল মনের উগ্র ডানপন্থিদের আরও চরমপন্থি করে তোলে। অন্যদিকে কিছু তরুণ মুসলমানের মধ্যেও ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম দেয়। আর একটি কথা পরিষ্কার করে বলি, যে কেউ যদি দাবি করে যে সে সব মুসলমানের হয়ে কথা বলছে, সে আমার হয়ে কথা বলছে না। আমরা এতটাই বৈচিত্র্যময়, মতপ্রকাশে এতটাই স্বাধীন এবং ব্রিটিশ জীবনের প্রতিটি স্তরে এতটাই জড়িত যে, আমাদের এক কণ্ঠ বা এক ছাঁচে বেঁধে ফেলা যায় না। এই রমজানে আমাদের লাখ লাখ মানুষ ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীরবে রোজা রাখবেন। আমরা প্রতিবেশীদের খাবার দেব। আমরা দান করব, অন্য যে কোনো গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। আমরা এমন একটি দেশের জন্য প্রার্থনা করব, যাকে আমরা গভীরভাবে ভালোবাসি। প্রশ্নটি আজ মুসলমান হওয়ার অর্থ কী তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ব্রিটেন কি আমাদের প্রকৃত রূপে দেখতে প্রস্তুত। শিরোনাম হিসেবে নয়, হুমকি হিসেবে নয়, কোনো ছাঁচে ঢালা ধারণা হিসেবে নয়, বরং সহ-নাগরিক হিসেবে। লেখক: ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু

আপনার মতামত লিখুন
Ad Image
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর