বাজার ব্যবস্থায় নৈতিকতার সংকট
আধুনিক সময়ের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো ‘বাজার’। তাত্ত্বিকভাবে বাজার হওয়ার কথা ছিল এমন একটি স্থান, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিনিময়ের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘বাজার’ শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব কাজ করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ছাড়িয়ে যে বিষয়টি আজ সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো বাজার ব্যবস্থায় চরম নৈতিক অবক্ষয়। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ যখন ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’ বা অদৃশ্য হাতের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং সামাজিক কল্যাণ একটি ভারসাম্য বজায় রাখবে। কিন্তু আমাদের দেশের বাজারে এখন কেবল ব্যক্তি-স্বার্থের জয়জয়কার। নৈতিকতা মানে এখানে কেবল ভালো-মন্দের বিচার নয়; বরং সততা, স্বচ্ছতা এবং অন্যের ক্ষতির কারণ না হওয়া। দুঃখজনকভাবে, আজকের বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং ভেজালের ভিড়ে সেই নৈতিকতা আজ নির্বাসিত। আমাদের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকট হলো ‘সিন্ডিকেট’। গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী বা আমদানিকারক যখন পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের আর কোনো হাত থাকে না। কোনো পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কেবল দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। ইসলাম ধর্মসহ পৃথিবীর সকল ধর্ম ও দর্শনে এই ‘এহতিকার’ বা মজুতদারিকে চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবুও পবিত্র মাস রমজান বা উৎসবের মৌসুমে দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে অতিমুনাফা লাভের প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা স্পষ্টতই নৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ। বাজার ব্যবস্থার নৈতিক সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো খাদ্যে ভেজাল। মুনাফার নেশায় মানুষ কতটা অন্ধ হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে মাছ-মাংসে ফরমালিন, সবজিতে বিষাক্ত রঙ কিংবা দুধে ডিটারজেন্ট মেশানোর খবরগুলোতে। একজন ব্যবসায়ী যখন জানেন যে, তার বিক্রীত পণ্যটি খেয়ে একজন শিশু বা বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হতে পারে, তবুও তিনি তা বিক্রি করছেন—তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ ভেতর থেকে পচে গেছে। আমরা প্রতিনিয়ত বিষ কিনছি এবং সেই টাকা দিয়েই নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানা লিখছি। এটি কেবল ব্যবসায়িক অপরাধ নয়, এটি একটি নীরব গণহত্যা। পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে সঠিক ওজনে পণ্য দেওয়া নৈতিকতার অন্যতম দাবি। কিন্তু ডিজিটাল স্কেলের কারচুপি থেকে শুরু করে ভালো পণ্যের নিচে পচা পণ্য লুকিয়ে রাখার যে প্রবণতা খুচরা বাজারে দেখা যায়, তা ক্ষুদ্র হলেও নৈতিক সংকটের এক গভীর ক্ষত। সামান্য কয়েক টাকার লোভে নিজের সততাকে বিসর্জন দেওয়া এক ধরনের আত্মিক দৈন্য। উৎপাদক বা কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে যে বিশাল ফারাক, তার প্রধান কারণ মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। কৃষক হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলিয়ে ন্যায্য দাম পান না, অথচ সেই পণ্য যখন বাজারে আসে, তখন তার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই যে মাঝখানের কারবারিরা বিনা শ্রমে বা সামান্য পরিশ্রমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, এটি বাজার ব্যবস্থার এক বিরাট কাঠামোগত ও নৈতিক বিচ্যুতি। পরিশ্রমী মানুষের রক্তচোষা এ প্রথা সমাজকে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাজারের এ নৈরাজ্যের জন্য আমরা প্রায়ই প্রশাসনকে দোষারোপ করি। অবশ্যই বাজার মনিটরিং এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব রয়েছে। কিন্তু কেবল আইন দিয়ে কি নৈতিকতা শেখানো সম্ভব? প্রতি দোকানে একজন করে পুলিশ মোতায়েন করা অবাস্তব। সংকটটি মূলত আমাদের মনস্তাত্ত্বিক। আমরা যখন দেখি একজন ব্যবসায়ী অসৎ পথে কোটি টাকা আয় করে সমাজে সম্মানের আসনে বসেন, তখন তরুণ প্রজন্মও সেই পথ অনুসরণ করতে প্রলুব্ধ হয়। দুর্নীতির এ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাই বাজারকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে। বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে দেশে মুহূর্তের মধ্যে দাম বেড়ে যায়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়তে মাস পার হয়ে যায়, অনেক সময় কমেও না। এ যে ‘একমুখী দাম বৃদ্ধি’র সংস্কৃতি, এটি কেবল ব্যবসায়িক নীতি নয়, এটি মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে লুটতরাজ করার শামিল। উন্নত বিশ্বে সাধারণত উৎসবের সময় পণ্যের দাম কমে বা ছাড় দেওয়া হয়, আর আমাদের দেশে উৎসব এলেই মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাজার ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশের বাজার ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ এবং সাধারণ মানুষ সেখানে কতটা নিরাপদে পণ্য কিনতে পারছে, সেটিই বড় পরিমাপক। বাজার ব্যবস্থার এ নৈতিক সংকট সমাজকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মুনাফা অর্জন ব্যবসার অংশ, কিন্তু সেই মুনাফা যখন মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তোলে, তখন তা লুটের নামান্তর। সুরাইয়া বিনতে হাসান শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক : সন্তোষ শর্মা
প্রকাশক: মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু