শিরোনাম
শহিদুল ইসলাম নিরবের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা...
শহিদুল ইসলাম নিরবের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা...

আমার প্রাণ বকুল ঝরে গেছে বিনা বাতাসে, চাঁদের ক্ষত ঢাকা পড়ে নীল উদাসে, বুঝতে পারিনি তাকে দীর্ঘশ্বাসে।

রোদ্দুর ভাঙা আয়না পড়ে রক্ত আকাশে, স্মৃতিরা ধূপ হয়ে জ্বলে নিরালায় পাশে, ডেকেও ফেরেনি সে বিষণ্ন আশ্বাসে।

শুকনো নদী বুক চিরে কাঁদে উপবাসে, ভাঙা তরী ডুবে যায় ঘুমহীন স্রোতবাসে, ছুঁতে পারিনি তাকে শেষ প্রত্যাশে।

শহিদুল ইসলাম নিরবের গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা...

সেন্সেশন 

পোড়া মাটির বুকে শিউলি ঝরে নিরাশে, স্বপ্নগুলো ছাই হয়ে উড়ে সর্বনাশে, রেখে গেল শূন্যতা শুধু নিশ্বাসে।

বাসন্তী সন্ধ্যা

আজ বহু বছর পরে সেই কলেজ মোড়ে হঠাৎ দেখা হয়েছিল তোমার আমার।

সব কথা ভুলে গিয়ে নত চোখ তুলে দিয়ে শব্দহীন ভাষায় কেঁপে উঠল অন্তর।

ঝরা শিউলির মতো নীরব স্মৃতিগুলো যত পথের ধারে ছড়িয়ে দিল ব্যথার ঘোর।

শীতের কুয়াশা হয়ে অভিমান গোপনে রয়ে কাঁপা কাঁপা সুরে জেগে উঠল মনভোর।

ডুবন্ত রৌদ্রসম ক্ষণিক হাসি অনুপম মুছে গেলে সন্ধ্যার গভীর আঁধার।

দীপশিখা নিভে যায় তবুও স্মৃতিরা বেঁচে রয় বিরহ আমার রয়ে গেল বসন্ত অপার।

 

ফানা ফুলে ফুরাই

ঘর ছেড়ে হৃদয় ঘোরে, হৃদয় ডোবে হিজরানে, ডাক শুনি দূর দরিয়ায়, দিল ডাকে দিলজানে।

নফস নামের নেকড়েটা ওই, নখে দেয় নাছোড় টান, নূরের নেশায় নিঃশেষ হই, নেই আর আমি-জ্ঞান।

ইশক আগুন, ইশক আকাশ, ইশকই আমার শ্বাস, পুড়ে পুড়ে পথ চিনেছি, পুড়নেই তো বাস।

ফানা ফুলে ফুরাই যখন, ফুরায় নাম-নিশান, শূন্য শরীরে জাগে তখন বাকায়ি বিস্ময়-প্রাণ।

দয়াল দাতা, দম্ভ দাও দানা দানা ঝরাই, আমি ভাঙি, তুমি থাকো, ভাঙনেই তো পাই।

নূর নামে নিঃশব্দে নীল নিশ্ছিদ্র রাতে, চোখের আলো নেভালে তবে হৃদয় দেখে তাকে।

সিমুর্গ আমি, সাত সরণি সাধনায় হেঁটে যাই, শেষে গিয়ে দেখি আমি, আমি ছিলাম নাই।

অদেখাকে ডাকি ধ্যানে, বোবার মতন থাকি , দেখে যারা দেখে না তবু, তারাই সত্য জানি।

চরণধুলায় চূর্ণ চেতনা, চূর্ণেই চরম রস, আমি হারাই, তিনি থাকেন, এই তো ইশকের বস।

 

অঘোর ঘোরে

রাত চলে গেছে রাতেরই পেটে, চাঁদ নির্বাসিত মেঘের ওপার। এই অন্ধকারের গর্ভেই জন্ম নেয় পবিত্র আলো, এই অন্ধকারেই ফিরে আসে সূর্যসন্তান।

তারা জানে পৃথিবীর ব্যাকরণ তারা জানে কেমন করে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, কেমন করে নীল নক্ষত্রের মতো আলো জ্বেলে আবার নিঃশব্দে মিলিয়ে যেতে হয়।

আর আমরা যারা অঙ্কের ভুলে জীবনের পবিত্রতা নষ্ট করি, ভাগফল শূন্য করে তাতে আনন্দ খুঁজি তারা আমৃত্যু অঘোর ঘোরেই ঘুরে মরি।

 

অপেক্ষা

বাসন্তী, তুমি ভেবেছ—বসন্ত মরে গেছে? না, বসন্ত মরে না। বসন্ত কেবল শিশিরহীন শালবনে তোমাকে না-দেখার তৃষ্ণায় শুকনো পাতার মতো মরতে বসেছে।

কোন মেঘের আড়ালে তুমি— রোদের কাছ থেকে চুরি হওয়া সকাল? কত ঋতু বয়ে গেল নদীর বুকে ভাঙা নৌকার মতো, তবু তুমি এলে না।

তোমার ভালোবাসার নয়ন আজ সাত সমুদ্রের ঝরনা— লোনা, নীল, অথচ আগুনে ভেজা; সে চোখে জমে আছে অপেক্ষার শৈবাল, অভিমানের মুক্তো।

কেন তুমি এলে না, বাসন্তী? বকুল ঝরে গেল কারও কপালে চুমু না এঁকে, কোকিলের কণ্ঠ নিঃশব্দ হলো গলার ভেতর; ফাগুন দাঁড়িয়ে রইল খালি হাতে, ভিক্ষুকের মতো।

আমি আজও দাঁড়িয়ে আছি তোমার নামের দরজায়— বসন্তের মতো, যে জানে একদিন তুমি আসবেই; আর তখন এই মরতে বসা বসন্ত হঠাৎ করে সবুজ হয়ে উঠবে।

 

সুখের শিখা

মাঝে মাঝে তোমার কথা আসে ঝড়ের পর ফোটা রোদ্দুরের মতো— অন্যের কণ্ঠে, অন্যের জানালায়, তবু সেই আলো ছুঁয়ে যায় আমার বুকের উপকূল।

শুনি— স্বপ্ন-সিন্ধুর মতো গভীর তোমার স্বর্গসুখ, বিত্তের বহ্নিশিখা যেন দীপাবলির বিস্তার, আনন্দের অবিরাম ঢেউ আছড়ে পড়ে তোমার জীবনের নীল সমুদ্রে।

আর আশ্চর্যভাবে, সে ঢেউয়েরই ফেনা এসে জুড়িয়ে দেয় আমার ক্লান্ত হৃদয়— হিংসের ধূসর ধুলো একফোঁটাও ওঠে না, বরং তুলোর মতো নরম শান্তি নেমে আসে নিঃশব্দে।

কারণ— তোমাকে এমনই উজ্জ্বল দেখতে চেয়েছি আমি, আমার সমস্ত রৌদ্র ত্যাগ করেও তোমার জানালায় একটুখানি আলো রাখতে চেয়েছি। তোমার হাসি আমার বুকের ভিতরের শোক-ঝড় থামায়, শুকনো পাতার মতো কাঁপতে থাকা হৃদয়ে শিশির হয়ে নামে।

হে ঈশ্বর— যদি দহনই হয় আমার নিয়তি, তবে সেই আগুনের ছাইয়ে তুমি তার সুখের শিখা আরো দীপ্ত করো। আমার নিঃশব্দ পোড়ার ভিতর থেকে উঠে যাক তার জীবনের আলো, উজ্জ্বল, উষ্ণ, অক্ষয়।

 

দোজগ পোড়া আগুনে ঋদ্ধ কাক

দোজগ পোড়া আগুনে ঋদ্ধ কাক উড়ে যায়, ডানার ছায়া রাতের নদীতে ডুবে থাকে, কার সুখ বার্তা বয়ে নিয়ে যায় অদেখা আলোতে? মেঘ কাঁদে পাহাড়ের ভেতর, পাখি সূর্যের রক্তে বুনে অমর স্বপ্নের পালক, নদী আকাশে ভেসে বেড়ায় শিশিরের অদৃশ্য নকশায়।

পথিক, তুমি সব সুখ সাঙ্গকরে, পাতার ছায়া বলে নদীর কথা, বাতাস নিজেকে চুম্বন করে, প্রতিটি ছায়া জ্বলন্ত আগুনের মতো নাচে, নক্ষত্র নেমে আসে তোমার পায়ের ছাপে, এক নিশ্বাসে নদী ছুঁয়েছে আকাশের গহ্বর, অন্তহীন শান্তির মধ্যে জেগে ওঠে অস্তিত্বের অনন্ত আলো।

 

 

আরেক জীবন

জীবন ছিলো যেন কাঁচের ঘুঙুর—বেজেছে ক্লান্ত সুরে, আকাশের চিঠির মতো ছেঁড়া, নীলেমাখা আশা। দুঃখ এসেছিলো নদী হয়ে, ঘরে ঘরে ঘুরে, তবু পুষেছি হৃদয়ে চুপিসারে ভালোবাসা।

স্বপ্নগুলো কাগুজে নৌকা—বৃষ্টিতে ডুবেছে চুপ, তবু ভিজিনি অভিমানে, করিনি অভিযোগ। হারিয়েছি যেমন পাখির ছায়া সন্ধ্যারূপ, তেমনি চেয়েছি—জয় নয়, হোক মানবিক সংলাপ।

কে ভাঙলো শপথ? সে কি তপ্ত রোদে গলে যাওয়া মোম? মনে নাই সে মুখ, নেই আর কোনো অশ্রুকণিকা। মনে আছে শুধু, মানুষের মুখ যেন জোনাকির ঝলক, তাদের হাসি, চোখের ভাষা—সব ছিলো কবিতা।

মৃত্যু আসুক, চাঁদের মতো নরম কোনো রাতে— হৃদয়ে থাক ভালোবাসা, অভিযোগহীন প্রাতে।

 

বৃক্ষ ধ্যানমগ্নতা

বৃক্ষের মতো... একের ধ্যানমগ্নতায় পার হয়ে গেলো আমার কয়েকটি জনম

এরই মধ্যে নিজেকে গিলে ফেলেছি বহুবার ফিনিক্সের মত জেগেও ওঠেছি অনেক বার

এই সব নীল আর কালোর প্রতিবন্ধকতা আমাকে কখনো দাবায়ে রাখতে পারে নি

আমি জানি, নীল কালোর দেশ পাড়ি দিয়েই আলোর দেশে যেতে হয়, পরমকে ছুঁতে হয়।

 

কোথাও পুড়ছে

কোথাও পুড়ছে— বৃষ্টিভেজা আকাশের ফুসফুস, ঝড়ের গর্ভে লুকোনো বজ্রশিশু, পাতার শিরায় জমে থাকা রক্তের সবুজ।

কোথাও পুড়ছে— জোৎস্নার হাড়, নদীর নিঃশ্বাস, পাখিদের নীরব প্রার্থনা। মাটির ভেতরে দগ্ধ হচ্ছে শেকড়, যেন ধানক্ষেতে লাশ পোড়ানোর গোপন আগুন।

আমি ধোঁয়া গন্ধ পাই— যেন দিগন্তের মৃত মুখ থেকে উড়ে আসা ছাই, যেন সময়ের গলিত মোমে জ্বলে ওঠা মৌনতা।

কোথাও পুড়ছে— ক্ষুধার অন্ত্র, প্রেমের বীজ, কামনার জঙ্গল, স্মৃতির সমুদ্র। দগ্ধ হচ্ছে পাথরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা নদী, ভেঙে যাচ্ছে নক্ষত্রের হাড়গোড়।

কোথাও পুড়ছে— প্রবল ক্ষোভে, ক্ষমতার লোভে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়, ক্ষমতার বদ নেশায়—

কোথাও পুড়ছে— চুপচাপ, মুখ বুজে, গনগনে— যেন সূর্যকে গিলে ফেলা কালো পাখি, যে ঝড় এলেই উড়ে যাবে রক্ত-ডানায়।

কোথাও পুড়ছে— প্রকাশ্যে, মানুষের চোখে, স্বদেশের বুকে, আমাদের সবচেয়ে গভীরতম ব্যথায়।

 

তার চোখের অসীমে

চোখ যেন তার কৃষ্ণগহ্বর যে চোখের অনন্ত অসীমতায় আমার জীবন ডুবে যায়!

হৃদয় যেন তার বারমুডার ট্রায়াঙ্গল! সেই যে ঢুকেছি আর ফেরা হয় নি, ফেরা যায় না।

সে চোখের মায়ায় আমি যেন এক আসক্ত প্রেমিক ফেরার ইচ্ছে ঢ়ের ফেরা যায় নি, ফেরা যায় না।