মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত চাপ পুরোপুরি কাটেনি। আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবারও বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
ফলে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশই থাকছে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশঙ্কা করছে, বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতেও ধীরগতি
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।
বেসরকারি ঋণে গতি নেই
নীতি সুদহার কমানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও বিতরণে বড় ধরনের গতি ফেরেনি। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বেসরকারি ঋণের চাহিদা কম থাকার অন্যতম কারণ।
এদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার ও ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি
বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।
এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।
আগামী অর্থবছরে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও এর গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, দেশের জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।