শিরোনাম

সনদসর্বস্ব শিক্ষার অভিশাপ: প্রথাগত ডিগ্রি নয়, কর্মমুখী শিক্ষাই রূপান্তরের পথ

সনদসর্বস্ব শিক্ষার অভিশাপ: প্রথাগত ডিগ্রি নয়, কর্মমুখী শিক্ষাই রূপান্তরের পথ

একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি তার শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নত ও দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, উদ্ভাবন, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অথচ বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিতভাবে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স সম্প্রসারণের ফলে উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানমুখী না হয়ে সনদনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এর পরিণতিতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের একটি কলেজে প্রফেশনাল ও অনার্স কোর্স উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায় আসে। সেখানে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এই আলোচনায় উঠে আসে, দেশের উচ্চশিক্ষাকে সময়োপযোগী ও কর্মসংস্থানবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা।

শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পনাহীনভাবে সাধারণ ডিগ্রি কোর্সের সম্প্রসারণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স চালু হয়েছে, যার সঙ্গে বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদার সামঞ্জস্য খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব দক্ষতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও রয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় শুধু প্রথাগত শিক্ষা নয়, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ব্যবসা প্রশাসন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার মতো খাতগুলোতে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন ক্রমাগত বাড়ছে। তাই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), বিবিএ, বি.এড., বি.পি.এড. এবং অন্যান্য কর্মমুখী ও পেশাভিত্তিক কোর্সে গুরুত্ব বাড়ানো সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কমিয়ে আঞ্চলিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় জেলায় আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ল্যাব এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকাতেই মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এতে ঢাকা-কেন্দ্রিক চাপও কমবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে গড়ে তোলাও বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌরশক্তির ব্যবহার, সবুজ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশ সচেতনতা শিক্ষার অংশ করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে উচ্চশিক্ষার সংস্কার শুধু নতুন কোর্স চালু করলেই হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয়, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর জবাবদিহিতা। উচ্চশিক্ষার প্রতিটি সিদ্ধান্তে শ্রমবাজারের চাহিদা, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক প্রবণতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সনদ অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটি সনদের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেটি একজন শিক্ষার্থীকে কতটা দক্ষ, কর্মক্ষম এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখার উপযুক্ত করে তুলছে তার ওপর। তাই সময় এসেছে সনদসর্বস্ব শিক্ষার সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও কর্মসংস্থাননির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার। একটি যুগোপযোগী, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষানীতিই পারে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে এবং দেশের টেকসই উন্নয়নের পথকে আরও সুদৃঢ় করতে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর