শিরোনাম
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে তিন ঘণ্টার সুরের মায়াজাল

জ্যোৎস্নার রাতে চৈতালী মুখার্জির কণ্ঠে ফিরে এলো পুরোনো দিনের গান

জ্যোৎস্নার রাতে চৈতালী মুখার্জির কণ্ঠে ফিরে এলো পুরোনো দিনের গান

রাত তখন ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। বাংলামোটরের ব্যস্ত নগরজীবন পেছনে ফেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে নেমেছে অন্যরকম এক নীরবতা। মাথার ওপরে জ্যোৎস্না, চারপাশে মৃদু আলো। সেই নীরবতা ভেঙে চৈতালী মুখার্জির কণ্ঠে ভেসে এলো পুরোনো দিনের চেনা সুর। কখনো প্রেম, কখনো বিরহ, কখনো হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি—একেকটি গান যেন শ্রোতাদের নিয়ে গেল ভিন্ন এক অনুভূতির জগতে। তিন ঘণ্টার সেই সংগীতসন্ধ্যায় জ্যোৎস্নার সঙ্গে মিশে রইল সুরের মায়া।

২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে ঐতিহ্যবাহী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশের ছাদে ‘আলোর ইশকুল—চৈতন্যের আলোকযাত্রা’র বিশেষ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় কণ্ঠশিল্পী চৈতালী মুখার্জির একক সংগীত সন্ধ্যা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্যদের আয়োজনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন।

শুরু থেকেই শ্রোতাদের মনোযোগ কেড়ে নেন চৈতালী। তাঁর কণ্ঠে একে একে উঠে আসে বাংলা গানের বহু জনপ্রিয় ও কালজয়ী সৃষ্টি। ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’, ‘এ শুধু গানের দিন’, ‘এ লগন গান শোনাবার’, ‘ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা’, ‘মরমী গো, আজি মনের কথাটি বলোনা’, ‘আর দেখো না সেই মধু নামে’, ‘এই মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে’ ও ‘অলিরও কথা শুনে বকুল হাসে’—গানগুলোতে যেন পুরোনো দিনের আবহ ফিরে আসে।

এরপর পরিবেশিত হয় ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’, ‘তারা ঝিলমিল স্বপ্ন মিছিল’, ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়’, ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ’, ‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’, ‘যদি কাগজে লেখ নাম মুছে যাবে’, ‘নদীর যেমন ঝরনা আছে, আমার আছে তুমি’ এবং ‘আমার সন্ধ্যায় প্রান্ত পাখিরা’সহ আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় গান।

গান বদলেছে, বদলায়নি শ্রোতাদের মুগ্ধতা। কখনো নরম প্রেমের আবেশ, কখনো বিরহের বিষণ্নতা, কখনো স্মৃতির নরম আলো—চৈতালীর কণ্ঠে প্রতিটি গানই পেয়েছে আলাদা আবেগ। জ্যোৎস্নামাখা রাত আর গানের সুর মিলিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদজুড়ে তৈরি হয় এক আবেশঘন পরিবেশ। গান শেষ হলেই করতালিতে শিল্পীকে অভিবাদন জানান উপস্থিত শ্রোতারা।

অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন অঙ্গনের গুণীজনের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে সংগীতসন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে আরও উপভোগ্য।

চৈতালী মুখার্জির পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, লেখক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ আলী খান শিল্পীর হাতে তাঁর সংকলন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি ও Song Offerings’ এবং তাঁর নিজের লেখা ‘৫০১ টাকা ও অন্যান্য গল্প’ বই দুটি উপহার দেন। শিল্পীর প্রতি সম্মান ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকে দেওয়া এ উপহার অনুষ্ঠানে সৃষ্টি করে বিশেষ এক আবেগঘন মুহূর্ত।

অনুষ্ঠান শেষে চৈতালী মুখার্জি বলেন, ‘এটি আমার সংগীতজীবনের একটি বড় অর্জন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো একটি জায়গায় একক সংগীত অনুষ্ঠান করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। এমন একটি আয়োজনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’

সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননশীলতার চর্চার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। ‘আলোকিত মানুষ চাই’—এই দর্শনের সঙ্গে সংগীতের এমন আয়োজন যেন যোগ করে আরেকটি মাত্রা। বই ও মননের সেই আঙিনায় সেদিন সুরও হয়ে উঠেছিল আলোর ভাষা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে, মঞ্চ নিভেছে, শ্রোতারাও ফিরেছেন নিজেদের গন্তব্যে। কিন্তু তিন ঘণ্টার সেই সুরের রেশ থেকে গেছে তাঁদের মনে। জ্যোৎস্নার আলোয় চৈতালী মুখার্জির কণ্ঠে পুরোনো দিনের গান—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে ২৬ সেপ্টেম্বরের রাতটি তাই হয়ে থাকল এক স্মরণীয় সংগীতসন্ধ্যা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর