শিরোনাম

আশাশুনিতে কপোতাক্ষ নদের বাঁধে ভাঙন, স্বেচ্ছাশ্রমে সাময়িক রক্ষা

আশাশুনিতে কপোতাক্ষ নদের বাঁধে ভাঙন, স্বেচ্ছাশ্রমে সাময়িক রক্ষা

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধে প্রায় ৫০ মিটার অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সোমবার ভোরে ভাঙন শুরু হওয়ার পর কয়েক শ স্থানীয় বাসিন্দা ঝুড়ি, কোদাল ও বস্তা নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি ও বালু ফেলে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সাময়িকভাবে রক্ষা করেন। তবে বাঁধটি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। জোয়ারের সময় নদীর পানি বাড়লে ফের ভাঙন দেখা দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ৩টার দিকে কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে বাঁধ ধসে ভাঙন শুরু হয়। সকাল ৭টার দিকে ভাঙন বড় আকার ধারণ করে। এতে প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে চলে যায়। একই সঙ্গে বাঁধসংলগ্ন ওয়াবদা সড়কের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই পথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

ভাঙনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সকাল থেকেই কয়েক শ স্থানীয় বাসিন্দা ঝুড়ি, কোদাল ও বস্তা নিয়ে বাঁধ রক্ষার কাজে নেমে পড়েন। দিনভর মাটি ও বালু ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি কোনো রকমে সাময়িকভাবে রক্ষা করা হয়। এতে আপাতত পানি প্রবেশ ঠেকানো গেলেও বাঁধের ঝুঁকি কাটেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের আশঙ্কা, জোয়ারে নদীর পানি বাড়লে দুর্বল হয়ে পড়া অংশটি আবারও ভেঙে যেতে পারে। এতে প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বৃষ্টিনন্দনসহ আশপাশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তলিয়ে যেতে পারে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও হাজার হাজার বিঘার মৎস্যঘের।

কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, ‘সারা বছরই নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের বাঁচতে হয়। কখন বাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নোনা পানিতে তলিয়ে যায়, সেই আতঙ্ক থাকে। অনেক কষ্টে এলাকায় গাছপালা ও ফসল হচ্ছে। আবার পানি ঢুকলে সব শেষ হয়ে যাবে। হাজার হাজার মৎস্যঘেরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

শ্রীপুর গ্রামের নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সকাল থেকে কয়েক শ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি ফেলে বাঁধটি সাময়িকভাবে রক্ষা করেছেন। আপাতত পানি ঠেকানো গেলেও বাঁধটি নিরাপদ নয়। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যে স্থানে ভাঙন হয়েছে, তার সামনেই খাল। বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেলে প্রতাপনগরের পাশাপাশি আনুলিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হতে পারে। আমরা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’

স্থানীয়দের দাবি, কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটসংলগ্ন এই বাঁধটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগেও একাধিক ঘূর্ণিঝড়ে একই স্থানে বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় ১৫০ ফুট বাঁধ ভেঙে যায়। তখন প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুরসহ চারটি গ্রাম প্লাবিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও মৎস্যঘের।

এরপর ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় একই এলাকায় প্রায় ১০০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে আবারও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বৃষ্টিনন্দনসহ আশপাশের এলাকায় পানি ঢুকে ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই দফায় পাউবো বাঁধটি সংস্কার করলেও স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। ফলে সামান্য দুর্যোগ কিংবা জোয়ারে নদীর পানির চাপ বাড়লেই নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওই এলাকার প্রায় ৪০০ মিটার বাঁধ সংস্কারের জন্য ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, বারবার সংস্কারের পরিবর্তে নদীর পানির চাপ বিবেচনায় নিয়ে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

এদিকে সোমবার সকালে ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস রবিউল বাসার। এ সময় প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ গাজী উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা সংসদ সদস্যের কাছে জানতে চান, টেকসই বাঁধ কবে নির্মাণ হবে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কাজ শুরু হচ্ছে না। এ সময় সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস রবিউল বাসার বলেন, অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুমার বলেন, বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা পরিস্থিতি দেখেছি। আনুমানিক ৫০ মিটারের মতো বাঁধে ভাঙন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় মাটি, জিওব্যাগ ও জিওরোলের মাধ্যমে পানি ঠেকানো গেছে। জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হবে।’

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর