শিরোনাম

২৬ বছর ধরে জাল সনদে চাকরির অভিযোগ, তদন্তে মাউশি

২৬ বছর ধরে জাল সনদে চাকরির অভিযোগ, তদন্তে মাউশি

রংপুর সদর উপজেলার শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদের বিরুদ্ধে অন্যের নাম ও শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে প্রায় ২৬ বছর ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে। প্রভাষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়ে বর্তমানে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচয় ও চাকরিসংক্রান্ত নথিপত্র তদন্ত করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) রংপুর অঞ্চল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া পৌর এলাকার ছোবাহান মাস্টারের ছেলে কাজল মাহমুদ ১৯৮৯ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। পরে ১৯৯১ সালে ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে ১৯৯৪ সালে অনার্স ও ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

নথি অনুযায়ী, ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের প্রস্তুতিকালে নিজের শিক্ষাগত সনদ ইংরেজি ভার্সনে রূপান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করেন কাজল মাহমুদ। তখন তিনি জানতে পারেন, ২০০২ সালের শুরুর দিকে হারানো বিজ্ঞপ্তি, অপরিচিত ব্যক্তির ছবি ও ঠিকানা ব্যবহার করে তার নাম ও পরিচয়ে ডুপ্লিকেট সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সনদগুলোতে নাম কাজল মাহমুদ ও পিতার নাম ছোবাহান মাস্টার উল্লেখ ছিল, যা প্রকৃত কাজল মাহমুদের পরিচয়ের সঙ্গে মিলে যায়।

এরপর প্রকৃত কাজল মাহমুদ নিজের নাম আংশিক পরিবর্তন করে রাফসান মাহমুদ এবং পিতার নাম আব্দুস ছোবহান উল্লেখ করে সনদ সংশোধনের আবেদন করেন। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ সংশোধন কমিটির সুপারিশে ২০০২ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তার এসএসসি, উচ্চমাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্সের সনদ সংশোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্রেও তার নাম রাফসান মাহমুদ, পিতা আব্দুস ছোবহান ও মাতা লুৎফুন নিহার উল্লেখ করা হয়। ঠিকানা দেওয়া হয় ঢাকার কাফরুল।

নথিপত্র যাচাইয়ে কাজল মাহমুদ ও রাফসান মাহমুদের শিক্ষাগত সনদে একাধিক তথ্যের মিল পাওয়া গেছে। রাফসান মাহমুদের এসএসসি পরীক্ষার রোল নম্বর ২৪৬, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৭৬০৫৮ এবং সেশন ১৯৮৭-৮৮। একই রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সেশন শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদের সনদেও রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের সনদে দুজনের রোল নম্বর ২৮৫৬৯। জাতীয় পরিচয়পত্রে দুজনের জন্মতারিখও একই—৩১ মার্চ ১৯৭৪।

অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রের দাবি, শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদের প্রকৃত নাম ফারুক হোসেন। তার বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে বলে জানা গেছে। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রে কাজল মাহমুদ নাম, পিতার নাম ছোবাহান মাস্টার ও মায়ের নাম ফাতেমা বেগম উল্লেখ রয়েছে। ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে রংপুর সিটি করপোরেশনের কামারপাড়া।

চাকরিসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, কাজল মাহমুদ ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ মহিলা কলেজে ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০০ সালের মে মাসে তিনি এমপিওভুক্ত হন। ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ওই কলেজে কর্মরত ছিলেন। পরদিন ১৪ আগস্ট কাউনিয়া মহিলা কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ৫ সেপ্টেম্বর শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ কাজল মাহমুদ। তিনি বলেন, “আমার সনদই সঠিক। রাফসান মাহমুদ আমার সনদ জালিয়াতি করেছেন। এ বিষয়ে আমি আইনি পদক্ষেপ নেব।”

শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হয়ে পটুয়াখালী থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি সন্দেহজনক। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে অধ্যক্ষের জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মাউশির রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অধ্যক্ষের শিক্ষাগত সনদ ও চাকরিসংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তার দেওয়া তথ্যে কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার দাবি করলেও তার কাছে মার্কশিট, প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ডসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, “রাফসান মাহমুদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, তার শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতি করা হয়েছে। এ কারণে তিনি পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করেছেন।”

কামরুজ্জামান পাইকার জানান, কাজল মাহমুদ নাম পরিবর্তন করে রাফসান মাহমুদ নামে সনদ সংশোধন করিয়ে থাকলে একই নামে নতুন করে সনদ পাওয়ার বিষয়টিও যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। শুধু মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, আনুষ্ঠানিক নথিপত্র পাওয়ার পর তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মাজেদ আলী জানিয়েছেন, শুধু শ্যামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় নয়, রংপুর অঞ্চলের কলেজগুলোতে অনিয়ম ও অসংগতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর