শিরোনাম
৮২২ কোটি টাকার প্রকল্পে ১১ মাসে কাজ ৩২%

কাদা-গর্তে দুর্ভোগে সাতক্ষীরা–ভেটখালী সড়কের যাত্রীরা

কাদা-গর্তে দুর্ভোগে সাতক্ষীরা–ভেটখালী সড়কের যাত্রীরা

সংস্কারের নামে মাসের পর মাস সড়ক খুঁড়ে রাখা, কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও কাদাপানি—বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যাচ্ছে যানবাহন, ঘটছে দুর্ঘটনাও। ৮২২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চললেও সাতক্ষীরা–ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ অংশে এমন দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কের সংস্কারকাজ এগোচ্ছে কচ্ছপগতিতে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী, শিক্ষার্থী, নিত্যযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের। দ্রুত কাজ শেষ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এসব স্থানে সৃষ্টি হয়েছে কাদা ও খানাখন্দ। পিচ্ছিল সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাঝারি ও হালকা যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি একটি গর্তে আটকে একটি ইজিবাইক উল্টে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিনই কোনো না কোনো যানবাহন গর্তে আটকে যাচ্ছে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

বাসচালক আব্দুর রউফ বলেন, “এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানেই জীবন বাজি রাখা। প্রতিদিন কোনো না কোনো গাড়ি কাদায় আটকে যাচ্ছে বা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। গাড়ি মেরামতের খরচ চালাতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা গচ্চা যাচ্ছে।”

শ্যামনগরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আশঙ্কাজনক রোগীকে এভাবে হাসপাতালে নেওয়া খুবই কঠিন। রাস্তার ঝাঁকুনিতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষকে এভাবে দুর্ভোগে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না।”

কালিগঞ্জের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়কটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানান তাঁরা।

৮২২ কোটি টাকার প্রকল্প

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা থেকে ভেটখালী পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির বিভিন্ন অংশ আগে থেকেই খানাখন্দে ভরা ছিল। পরে সড়কটির উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের জন্য ৮২২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

৬২ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ পাঁচটি প্যাকেজে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। তবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

সওজ সূত্র জানায়, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের কারণেও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি।

অনিয়মের সুযোগ নেই: ঠিকাদার

নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, “আমরা যখন কোনো নির্মাণসামগ্রী আনি, তখন সেটার উৎস অনুমোদিত থাকে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আনা হয়। অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।”

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণসামগ্রীর মানের পাশাপাশি কাজের গতি ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। নির্মাণকাজ চলাকালে বিকল্প চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

২০২৭ সালের জুনে শেষ করার আশা

সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হয়েছে। তবে ১১ মাসে কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

তিনি বলেন, “বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। আশা করছি, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে। নির্মাণকাজ নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।”

স্থানীয়দের দাবি, শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ালেই হবে না; জনদুর্ভোগ কমাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত ভরাট, কাদাপানি অপসারণ, যান চলাচলের উপযোগী অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে সড়কটির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বাড়বে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ। তাই ৮২২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ দ্রুত ও যথাযথভাবে শেষ করে সাতক্ষীরা–ভেটখালী মহাসড়কটি নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর