শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে একটি প্রজন্মকে আলোকিত করে তোলা—দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমনই এক দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও, যিনি শিক্ষার্থীদের কাছে সিস্টার মেরী খ্রীস্টিনা নামে পরিচিত।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমিলিয়া মিশন এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ নারী শিক্ষার বিস্তারে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও। ২০১৫ সালে কলেজ শাখা চালু হলে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণের সারথি হয়ে কখনো অভিভাবক, কখনো পথপ্রদর্শক, আবার কখনো অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার বিষয় নয়; শিক্ষার্থীদের সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ পৌরসভার বাঙ্গালহাওলা গ্রামের বাসিন্দা সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও। সেন্ট মেরী’স গার্লস স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষে ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৮৪ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে কাজ করেছেন দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ধানজুড়ি সেন্ট ফ্রান্সিস উচ্চ বিদ্যালয়েও।
শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানাগার ও গার্লস গাইড কার্যক্রম পরিচালনা এবং ওয়াইসিএসের মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শিক্ষা ব্যক্তিত্ব, নেপাল-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পুরস্কার ও মাদার তেরেসা স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি সেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সন্ন্যাসজীবন বেছে নিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা বলেন, ‘প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আমাদের একজন অভিভাবকের মতো। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্ব দেন। শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতেও তিনি আন্তরিক।’
তাঁরা বলেন, প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হলেও শুধু ফলাফলের মধ্যে তিনি শিক্ষার সাফল্য দেখেননি। শিক্ষার্থীদের সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
একান্ত সাক্ষাৎকারে সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও বলেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয়, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ প্রতিটি বিষয় তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। বিতর্ক, পাঠচক্র, বই পড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে।’
তাঁর দায়িত্বকালে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং স্কুল শাখাকে কলেজে উন্নীত করার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ২৭ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং পাসের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ।
মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাচীরঘেরা প্রবেশপথ ও প্রহরীর ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি কিশোরীদের মধ্যে মাদক, মোবাইল আসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিওর কাজের মূল দর্শন যেন একটিই—শুধু ভালো ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যারা নিজেদের পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে নারী শিক্ষার সেই ধারাই এগিয়ে চলছে।