শিরোনাম

লামায় জোত পারমিটের আড়ালে কোটি টাকার কাঠ পাচারের অভিযোগ

লামায় জোত পারমিটের আড়ালে কোটি টাকার কাঠ পাচারের অভিযোগ

বান্দরবানের লামা উপজেলায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জোত পারমিটের আড়ালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের দাবি, জোতের গাছ না কেটেই ট্রানজিট পারমিট (টিপি) নিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহন করা হয়েছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ বৈধ দেখিয়ে পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে লামা বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

লামা বন বিভাগের ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোতকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ওই জোতে সেগুন ও গামারীসহ মোট ২ হাজার ৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২২টি সেগুন ও ২৩৮টি গামারী গাছ রয়েছে। এসব গাছের বিপরীতে সেগুনের ১৮ হাজার ঘনফুট এবং গামারীর ২ হাজার ৭০০ ঘনফুট কাঠের সাইজলিস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়।

স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নথিতে ২ হাজার ৩৮৮টি গাছের সাইজলিস্টের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহনের জন্য প্রায় ৪৮টি টিপি নেওয়া হয়েছে। অথচ সরেজমিনে ওই জোতে গাছ কাটার তেমন কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। ফলে জোতের গাছ না কেটেই এত বিপুল পরিমাণ কাঠ কীভাবে পরিবহন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ৫০ নম্বর এফএল জোতের কাগজপত্র ব্যবহার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তা বৈধ কাঠ হিসেবে পরিবহন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি চক্র জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এতে একদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, ২০২৩ সালে জোত পারমিটের অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের সময়ে মেয়াদ বৃদ্ধি ও বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জোতের বাগানে গাছ কাটার দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, ৫০ নম্বর এফএল জোতে গাছ কাটার কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। অথচ প্রায় ৪৮টি টিপির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাঠ পরিবহন করা হয়েছে। এসব কাঠের প্রকৃত উৎস তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জোতের ফিলিং রেজিস্টারসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। এসব নথি যাচাই করা হলে কাঠের প্রকৃত উৎস এবং টিপি ইস্যু ও পরিবহনের পুরো চিত্র বেরিয়ে আসবে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জোতের মালিকদের কাছ থেকে টাকা লেনদেনের বিনিময়ে ফ্রি চলাচলের অনুমতিপত্র, ডি-ফরমসহ বিভিন্ন খালি ফরমে আগাম স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এমন একটি স্বাক্ষর করা খালি আবেদনপত্রও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এসব কাগজপত্র ব্যবহার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ বৈধ দেখিয়ে পরিবহনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।

এ বিষয়ে এর আগেও লামা বন বিভাগের ডিএফওর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং তদন্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী। তবে তদন্তের পর অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাগানের দায়িত্বে থাকা আব্বাস উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মুঠোফোনে সংযোগ না পাওয়ায় পরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

এদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ বন সংরক্ষক এম এ হাসান বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁরা ঘটনাস্থলে তদন্তে গেছেন। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ৫০ নম্বর এফএল জোতে গাছ না কাটার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, তদন্তে জোতের অনুমোদিত গাছ, সাইজলিস্ট, টিপি, ফিলিং রেজিস্টার এবং পরিবহন করা কাঠের পরিমাণ ও উৎস যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর