চিকিৎসক হাসপাতালে আসছেন না—অভিযোগ উঠছে। মন্ত্রী মাঠে যাচ্ছেন, অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও শোকজ, কোথাও প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এতে সাময়িকভাবে শৃঙ্খলার বার্তা যাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এভাবে কি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সংকটের সমাধান সম্ভব?
গত কয়েক মাস ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন এবং চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সরাসরি তদারকির উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। তবে মাঠপর্যায়ের এই অভিযানকে ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন—চিকিৎসকদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কোথায়?
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে জনবলসংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ, জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, বহির্বিভাগে সময়ানুবর্তিতার অভিযোগ এবং অপ্রয়োজনে রোগীকে উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করার প্রবণতা—এসব সমস্যা বহুদিনের। কিন্তু এসব কাঠামোগত সংকটের সমাধানে দৃশ্যমান উদ্যোগ কতটা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মন্ত্রী কেন হাসপাতালের হাজিরা দেখতে মাঠে নামবেন?
হাসপাতালে চিকিৎসক যথাসময়ে উপস্থিত হচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন মন্ত্রীর কাজ কি প্রতিটি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের হাজিরা পরীক্ষা করা?
চিকিৎসকদের উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন ও কর্মস্থলে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও আরএমওর। তাঁরা যদি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে একজন মন্ত্রীকে প্রতিনিয়ত মাঠে নেমে চিকিৎসকের উপস্থিতি যাচাই করতে হবে কেন?
এখানেই উঠে আসছে স্বাস্থ্য প্রশাসনের জবাবদিহির প্রশ্ন।
কোনো হাসপাতালে চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকলে শুধু ওই চিকিৎসককে শাস্তি দেওয়াই কি যথেষ্ট? নাকি তাঁকে নিয়মিত কর্মস্থলে রাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার দায়িত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন?
‘যেই লাউ, সেই কদু’—পরিদর্শনের পরও কেন বদলাচ্ছে না চিত্র?
মন্ত্রী পরিদর্শন করছেন, অনিয়ম ধরা পড়ছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—তারপরও যদি কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর একই ধরনের অভিযোগ আবার ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, ব্যবস্থাপনার গভীরে।
একজন চিকিৎসককে শাস্তি দেওয়া সহজ। কিন্তু একটি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে, প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবলের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আবার কোথাও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগই সীমিত।
ফলে প্রশ্ন হচ্ছে—শুধু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কি এসব সমস্যার সমাধান হবে?
দুপুরের পর কি সরকারি হাসপাতাল ‘আধা-বন্ধ’?
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নিয়মিত কর্মঘণ্টার পর পর্যাপ্ত চিকিৎসক কোথায়?
অভিযোগ রয়েছে, অনেক হাসপাতালে দুপুরের পর জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী একজন ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারকেই একসঙ্গে জরুরি রোগী, ভর্তি রোগী এবং নতুন রোগীর চিকিৎসা সামলাতে হয়।
একজন চিকিৎসকের ওপর একাধিক দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?
এখানে চিকিৎসকের অবহেলা যেমন তদন্তের বিষয়, তেমনি প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার প্রশাসনিক দায়ও প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারে না।
জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যদি রাতের বেলায় পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ না থাকে, তাহলে একজন গুরুতর রোগীর সামনে কার্যত কী বিকল্প থাকে?
‘ঢাকায় নিয়ে যান’—মফস্বলের হাসপাতালের সবচেয়ে সহজ সমাধান?
মফস্বলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় রোগীদের দ্রুত ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
পেটব্যথা, বুকব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—প্রতিটি রোগীর জন্য ঢাকাই কি শেষ ঠিকানা?
একজন রোগীকে ঢাকায় পাঠানোর আগে জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তারও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
কারণ একজন রোগীকে ঢাকা পাঠানো মানে শুধু একটি অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত চিকিৎসাব্যয়, সময়, রোগীর ভোগান্তি এবং রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ।
সকাল ৮টার রোগী কেন ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন?
সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, সকাল ৮টা থেকে রোগীরা হাসপাতালে উপস্থিত থাকলেও কোনো কোনো হাসপাতালে সকাল ১১টার আগে বহির্বিভাগে নিয়মিত রোগী দেখা শুরু হয় না।
আবার ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা পরিদর্শনের নামে কোনো কোনো চিকিৎসক বহির্বিভাগের নির্ধারিত সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো—নির্ধারিত কর্মঘণ্টা কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে?
আর যদি অভিযোগগুলো সত্য না হয়, তাহলে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করে তা খণ্ডন করা হচ্ছে না কেন?
স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমান নয়, প্রয়োজন ডিজিটাল হাজিরা, দায়িত্বভিত্তিক কর্মসূচি, রোগীসেবা তথ্য ও নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন।
মন্ত্রণালয় কি প্রতিটি হাসপাতালের ‘সুপারভাইজার’ হতে পারে?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের প্রতিটি হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করবে—এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না।
প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে প্রত্যেক কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকবে এবং ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিও থাকবে।
সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও আরএমও যদি তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে মন্ত্রীকে প্রতিটি হাসপাতালের চিকিৎসকের উপস্থিতি যাচাই করতে ছুটতে হবে না।
বরং কোনো হাসপাতালের সমস্যা বারবার হলে প্রশ্ন উঠতে পারে—সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কী করেছেন?
নরসিংদীর কৃতী চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সময়
স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা দেশের অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য প্রশাসক নরসিংদীর কৃতী সন্তান। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে বৃহত্তর স্বাস্থ্য সংস্কারে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
পাশাপাশি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মতো শক্তিশালী চিকিৎসক সংগঠনসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতাকেও নীতিনির্ধারণ ও সংস্কারের আলোচনায় কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্রশ্ন হলো—সরকারের হাতে যখন এত অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশাসক ও পেশাজীবী শক্তি রয়েছে, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ কেন আরও দৃশ্যমান হবে না?
আলটিমেটাম নয়, প্রয়োজন জবাবদিহির স্থায়ী কাঠামো
চিকিৎসকদের শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কিন্তু শাস্তিই যদি স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে—সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।
প্রয়োজন—
- জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা;
- ২৪ ঘণ্টা পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা চালু করা;
- জরুরি বিভাগে আলাদা ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা;
- আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো;
- হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা;
- বহির্বিভাগে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা;
- অপ্রয়োজনীয় রেফার কমাতে জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো;
- সিভিল সার্জন, তত্ত্বাবধায়ক ও আরএমওর জবাবদিহি নিশ্চিত করা;
- হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করা।
মন্ত্রীর সাফল্য পরিদর্শনের সংখ্যায় নয়, পরিবর্তনের ফলাফলে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের সাফল্য কতটি হাসপাতাল পরিদর্শন করা হলো, কতজন চিকিৎসককে শোকজ করা হলো কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো—শুধু এসব দিয়ে মাপা উচিত নয়।
সাফল্যের আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত—রোগী হাসপাতালে গিয়ে কত দ্রুত চিকিৎসা পেলেন, রাতে বিশেষজ্ঞ পেলেন কি না, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারলেন কি না, অপ্রয়োজনে ঢাকায় ছুটতে হলো কি না এবং সরকারি হাসপাতালে তাঁর আস্থা ফিরল কি না।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট কোনো একক চিকিৎসকের ব্যর্থতা নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন, জনবল, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির সমন্বিত সংকট।
তাই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যে কাঠামো চিকিৎসককে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়, যে প্রশাসন সেই দায়িত্ব তদারকি করে এবং যে ব্যবস্থাপনা রোগীকে সেবা দেয়—সেই পুরো কাঠামোতেই সংস্কারের হাত দিতে হবে।
কারণ একজন চিকিৎসককে শাস্তি দেওয়া হয়তো একটি দিনের খবর হতে পারে; কিন্তু একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী অর্জন।
এখন প্রশ্ন একটাই—চিকিৎসকদের শাস্তি দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সত্যিকারের পরিবর্তন আনা হবে?