শত বছরের ঐতিহ্য ধরে আজও ভোর হলেই জমে ওঠে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিষখালী বাজারের দুধের হাট। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে কৃষক, খামারি ও গৃহস্থরা গরুর দুধ নিয়ে হাজির হন এখানে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে মাপজোক, দরদাম ও কেনাবেচা। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতিদিন এ বাজারে ২০০ থেকে ৩০০ মণ দুধ কেনাবেচা হয়। দুধ বিক্রির আয় এখন বহু পরিবারের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস।
সময়ের সঙ্গে খলিষখালী বাজারের চেহারা বদলেছে, বেড়েছে মানুষের আনাগোনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তবে ভোরের দুধের হাটের সেই পুরোনো ব্যস্ততা এখনো অটুট। খলিষখালী, মাগুরা, ইসলামকাটি, সরুলিয়া ও খেশরা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা দুধ নিয়ে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকেও ক্রেতারা আসেন এ বাজারে।
সাধারণত সকাল ১১টার মধ্যেই দুধের বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি দুধ ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে দুধের মান, সময় ও ক্রেতাভেদে দাম কিছুটা কমবেশি হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
দুধ বিক্রির টাকায় চলে সংসার
খলিষখালী ও আশপাশের এলাকায় গরু পালন এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত আয়ের একটি মাধ্যম। কারও বাড়িতে এক-দুটি গরু, আবার কেউ গড়ে তুলেছেন ছোট খামার। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত দুধ বাজারে বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন তাঁরা।
পাকশিয়া গ্রামের মনোরঞ্জন মন্ডলের খামারে ১২ থেকে ১৫টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি গাভি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কেজি দুধ পান তিনি। প্রতিদিন সকালে সেই দুধ নিয়ে আসেন খলিষখালী বাজারে।
মনোরঞ্জন মন্ডল বলেন, “৪৫ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে, কখনো এর চেয়েও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। তবে দুধ বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার ভালোভাবে চলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করতে পেরেছি।”
বাগমারা গ্রামের পল্লী চিকিৎসক শাহিদুল ইসলামও প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কেজি দুধ উৎপাদন করেন। নিয়মিত বাজারে দুধ বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটান তিনি।
শাহিদুল ইসলাম বলেন, “খলিষখালী দুধের বাজারের কারণে আশপাশের গ্রামের মানুষ বাড়িতে গাভি পালন করছেন। সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে খলিষখালীর মতো দুধের বাজার আর কোথাও নেই। এ বাজারের ইতিহাসও অনেক পুরোনো।”
মাদরা গ্রামের হরি মন্ডল প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কেজি দুধ নিয়ে বাজারে আসেন। তিনি জানান, প্রতি কেজি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে দুধ বিক্রি করেন। বয়রাডাঙ্গা গ্রামের রবিউল খাঁ বলেন, “প্রতিদিন বাড়ি থেকে দুধ নিয়ে আসি। দুধ বিক্রির আয় দিয়েই সংসার চলে।”
কয়েক দশক ধরে দুধের ব্যবসা
খলিষখালী বাজারে দুধ কেনাবেচার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যুক্ত রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। কাদিকাটি গ্রামের সঞ্জয় দাস ও বিষ্ণু কুমার দাস, সরুলিয়ার শুভঙ্কর ঘোষ, দুলাল ঘোষ ও সমীর ঘোষ এবং রাজেন্দ্রপুর গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় ঘোষসহ অনেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, বছরের পর বছর বাজারের চেহারা বদলালেও দুধের কেনাবেচা কমেনি। বরং আশপাশের এলাকায় গরু পালন বাড়ায় দুধের সরবরাহও বেড়েছে। দুধের ব্যবসা করে অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
এ বাজার থেকে সংগ্রহ করা দুধ পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল, মিষ্টির দোকান ও খাবারের প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক সুনীল দে বলেন, সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদ, পূজা, বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দুধের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ে এবং দামও কিছুটা বাড়ে।

জমিদার আমলের স্মৃতি
খলিষখালী বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদার আমলের ইতিহাস। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিদার ননী বসুর দান করা জমিতে বাজারটির গোড়াপত্তন হয়। পরে সময়ের সঙ্গে এটি স্থানীয় মানুষের অন্যতম বেচাকেনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
স্থানীয় প্রবীণ চন্ডীচরণ হোড় বলেন, “খলিষখালী এলাকায় একসময় জমিদারদের বসতি ছিল। সেই সময় থেকেই বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে। প্রায় শত বছর ধরে বাজারটি মানুষের কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।”
ডা. কামাল কুমার দাস বলেন, “খলিষখালী বাজারের ইতিহাস অনেক পুরোনো। সময়ের সঙ্গে বাজারের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু এর ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে। ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে বাজারের চারপাশ জমে ওঠে। বিশেষ করে দুধের বাজার বসার সময় এখানে আলাদা কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়।”
বাজারের পাশে রয়েছে একটি পুরোনো বটগাছ। গাছটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েকটি চায়ের দোকানসহ ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভোরে দুধের বাজার বসার সময় এসব দোকানেও মানুষের ভিড় দেখা যায়। পুরোনো বটগাছ, বাজারের ব্যস্ততা আর দুধের হাট—সব মিলিয়ে খলিষখালীর ভোর যেন স্থানীয় জীবনেরই একটি চেনা দৃশ্য।
উৎপাদন খরচ বাড়ায় দুশ্চিন্তা
দুধের জমজমাট বাজারের আড়ালে খামারি ও গৃহস্থদের দুশ্চিন্তাও রয়েছে। খলিষখালী গ্রামের আবু বক্কর সরদার বলেন, গরুর খাবার, চিকিৎসা, শ্রমিকের মজুরি ও খামার পরিচালনার খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে দুধ উৎপাদনের খরচও বেড়েছে।
খামারিদের মতে, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুধের দাম না পেলে গরু পালন করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁরা দুধের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
বিশেষ করে গরমের সময় দুধ দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাজারে শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে দূরের ক্রেতাদের কাছেও দুধ সরবরাহ সহজ হবে বলে মনে করেন তাঁরা।
তালা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাছুম বিল্লাহ বলেন, গরু পালনের ক্ষেত্রে সুষম খাবার, নিয়মিত টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধে খামারিদের সচেতন থাকতে হবে। দুধ দোহন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও জরুরি। এতে দুধের মান ভালো থাকবে এবং খামারিরা ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দুধ সংগ্রহে নতুন কেন্দ্র
ভোরের দুধের বাজারের পাশাপাশি খলিষখালীতে বর্তমানে তিনটি দুধ সংগ্রহকেন্দ্র চালু হয়েছে। দুপুর ও সন্ধ্যায় গাভি থেকে দ্বিতীয় দফায় সংগ্রহ করা দুধ এসব কেন্দ্রে বিক্রি করেন খামারি ও গৃহস্থরা। এতে দুধ বিক্রির সুযোগও বেড়েছে স্থানীয় মানুষের।
শত বছরের পুরোনো খলিষখালী বাজার আজও ভোরের দুধের হাটের কারণে আলাদা পরিচয় ধরে রেখেছে। একদিকে জমিদার আমলের ইতিহাস, অন্যদিকে গরু পালন করে জীবিকা গড়ে তোলা—দুইয়ের সমন্বয়ে এ বাজার এখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, আশপাশের বহু পরিবারের আয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
স্থানীয়দের মতে, দুধের ন্যায্য দাম, সংরক্ষণ সুবিধা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবহন ও আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে খলিষখালীর দুধের হাটের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।