পঞ্চগড় জেলা শহরের আনোয়ার প্লাজায় স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স ছাড়াই প্যাথলজি সেবা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে ‘মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লিভার পরীক্ষার রিপোর্টে বড় ধরনের গরমিল এবং রোগীকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও উঠেছে।
এ ঘটনায় সাইদুজ্জামান রেজা (৪৪) নামে এক রোগী মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, একই দিনে তিনটি প্রতিষ্ঠানে এসজিপিটি পরীক্ষা করালে দুটি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টের সঙ্গে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টে ব্যাপক পার্থক্য পাওয়া যায়।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় রোগী ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া প্যাথলজি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকলে তা বন্ধসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
একই দিনে তিন রিপোর্টে বড় পার্থক্য
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার (৯ আগস্ট) লিভারজনিত সমস্যায় আক্রান্ত সাইদুজ্জামান রেজা প্রথমে পঞ্চগড় মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালে এসজিপিটি পরীক্ষা করান। সেখানে তাঁর এসজিপিটি মাত্রা পাওয়া যায় ১২৭ ইউ/এল। চিকিৎসকের পরামর্শে একই দিন তিনি আবার পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
পরে একই দিন মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এসজিপিটি পরীক্ষা করালে রিপোর্টে মাত্র ২৬ দশমিক ৭ ইউ/এল পাওয়া যায়। দুটি রিপোর্টের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকায় মেডিকেয়ারের রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় তাঁর।
এরপর লিভারের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শে সোমবার (১০ আগস্ট) পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তৃতীয়বার এসজিপিটি পরীক্ষা করান তিনি। সেখানে তাঁর এসজিপিটি মাত্রা পাওয়া যায় ১২১ ইউ/এল।
পরপর তিনটি পরীক্ষার মধ্যে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়ায় প্রতারণার অভিযোগ এনে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন সাইদুজ্জামান।
লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজি কার্যক্রমের অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না নিয়েই প্রতিষ্ঠানটিতে লিভারসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
একই টেকনোলজিস্ট দুই প্রতিষ্ঠানে
অভিযোগের আরেকটি দিক হলো—সাইদুজ্জামানের পরীক্ষা করা দুই প্রতিষ্ঠানে একই টেকনোলজিস্ট আবুল বাশার দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। তিনি ডিপ্লোমাধারী টেকনোলজিস্ট।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই রোগীর একই ধরনের পরীক্ষা একই টেকনোলজিস্টের মাধ্যমে দুটি প্রতিষ্ঠানে করানোর পর কেন দুই ধরনের রিপোর্ট পাওয়া গেল—এ বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এর আগেও আবুল বাশারের করা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে চলতি বছর পঞ্চগড় মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতাল থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
.jpeg)
পরিচালকের দাবি, ‘রিপোর্টে ভুল নেই’
অভিযোগের বিষয়ে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সৈয়দা নাসরিন মিনুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সাংবাদিকের সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা বলেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের দেওয়া রিপোর্টে কোনো ভুল নেই।
তবে একই রোগীর তিনটি প্রতিষ্ঠানে করা পরীক্ষার ফলাফলের পার্থক্য এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
তদন্তের আশ্বাস সিভিল সার্জনের
পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মেডিকেয়ার সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগকারী রোগীর পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানে করা এসজিপিটি পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তের পরই প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, প্যাথলজি কার্যক্রমের অনুমোদন এবং রিপোর্টে গরমিলের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।