শিরোনাম
স্মৃতির পাতায় আজও অম্লান

প্রজন্ম গড়ার কারিগর প্রফেসর শাহ হালীমুযযান

প্রজন্ম গড়ার কারিগর প্রফেসর শাহ হালীমুযযান

নরসিংদীর শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত একটি নাম—প্রয়াত অধ্যাপক শাহ হালীমুযযান। নরসিংদী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের এই প্রাজ্ঞ শিক্ষক ছিলেন শুধু একজন অধ্যাপক নন; তিনি ছিলেন প্রজন্ম গড়ার কারিগর, মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষক এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যের এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি পাঠদানকে কখনোই শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সৌন্দর্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তিনি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রতিটি ক্লাস ছিল প্রাণবন্ত, যুক্তিনির্ভর ও চিন্তার খোরাক জোগানো। ফলে তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে শিক্ষা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সুনামের সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
অধ্যাপক শাহ হালীমুযযান বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষের মনন, বিবেক ও চরিত্র নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই দর্শন থেকেই তিনি সাহিত্য পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানেই ছিল আলোকিত মানুষ গড়ার আজীবন সাধনা।
নরসিংদীর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া, সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন সমসাময়িকরা।
তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল বিনয়, প্রজ্ঞা, সততা ও মানবিকতা। সহকর্মী, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ মানুষ—সবার কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধা, আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠ শেখাননি; শিখিয়েছেন নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহিত্যপ্রেম, শিক্ষাদর্শ এবং সাংস্কৃতিক চেতনা নরসিংদীর অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে আজও অম্লান। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে গেলেও তাঁর অবদান মুছে যাওয়ার নয়। তিনি নরসিংদীর শিক্ষা-সাহিত্য অঙ্গনের এমন এক বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় বেড়ে উঠেছে অসংখ্য আলোকিত মানুষ।
প্রয়াত অধ্যাপক শাহ হালীমুযযানের জীবন ও কর্ম নিয়ে দলিলভিত্তিক গবেষণা, স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া আজ সময়ের দাবি। কারণ, এমন গুণী মানুষের জীবনকর্ম সংরক্ষিত হলে শুধু নরসিংদীর নয়, বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও আরও সমৃদ্ধ হবে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ করবে একজন আদর্শ শিক্ষক, প্রাজ্ঞ সাহিত্যপ্রেমী এবং আলোকিত মানুষ গড়ার নিবেদিতপ্রাণ কারিগর হিসেবে। তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতা।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর