ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই একই টেবিলে বসলেন সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মো. হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহর এই সৌজন্য সাক্ষাৎকে ঘিরে সাতক্ষীরার রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ প্রশাসকের কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে জেলা পরিষদ প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ। এ সময় সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকও উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাতে জেলার উন্নয়ন, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। জলাবদ্ধতা নিরসন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের বিকাশ, ভোমরা স্থলবন্দরের আধুনিকায়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে মতবিনিময় করেন তাঁরা।
নির্বাচনের পর তৈরি হয়েছিল দূরত্ব
সাতক্ষীরা-১ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ বিজয়ী হন। ১৬৯টি কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট পান। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব পান ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান ইজ্জত উল্লাহ।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আসনটিতে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম, ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বা আদালতে কোনো অভিযোগ করেননি তিনি। ফলে তাঁর বক্তব্যগুলোকে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন নিয়েও উত্তেজনা
নির্বাচনের পর তালা ও কলারোয়া উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করেও বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
চলতি সপ্তাহে কলারোয়া উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের সিংনাল-বাটরা সড়কের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর প্রথমে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ এবং পরে সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব একই সড়কের উদ্বোধন করেন।
এ নিয়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
‘দলের ঊর্ধ্বে দেশ’
তবে বিরোধের মধ্যেই মঙ্গলবারের সৌজন্য সাক্ষাতে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন দুই পক্ষের নেতারা।
হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, ‘দলের ঊর্ধ্বে দেশ এবং ব্যক্তির ঊর্ধ্বে সমষ্টি। সাতক্ষীরা আমাদের সবার। জেলার উন্নয়নের জন্য সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, বিরোধী দলের দুই সংসদ সদস্য তাঁর কার্যালয়ে এলে তাঁদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় তাঁদের আপ্যায়নও করা হয়।
অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ জেলার সামগ্রিক সমস্যা নিয়ে জেলা পরিষদ প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সঙ্গে সৌজন্য আলোচনা হয়েছে। তিনি আন্তরিকভাবে তাঁদের কথা শুনেছেন।
উন্নয়নই কি সমঝোতার নতুন ক্ষেত্র?
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরবর্তী সময়ের নানা বিরোধের পর দুই নেতার এ বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটিকে সরাসরি রাজনৈতিক সমঝোতা বলা এখনই সম্ভব নয়।
তবে জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ, পর্যটন, ভোমরা স্থলবন্দর, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের একসঙ্গে কাজ করার বার্তা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু নির্বাচনের পর জনস্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা থাকলে এর সুফল সাধারণ মানুষই পাবে।
এখন দেখার বিষয়, হাবিব-ইজ্জত উল্লাহর এই সৌজন্য সাক্ষাৎ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সাতক্ষীরা-১ আসনে নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে উন্নয়ন ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বাস্তব কোনো সমন্বয়ের পথ তৈরি হয়।