কারাগারে বন্দী থেকেও ‘শিক্ষা ছুটি’র নামে বেতন উত্তোলনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় রংপুরের কাউনিয়ার মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বেতন সাময়িকভাবে বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বেতন সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
এ ঘটনায় কলেজটির অধ্যক্ষ আবুল কালাম মো. জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে অবৈধ উল্লেখ করে তাকে ‘চূড়ান্ত বরখাস্তের’ সুপারিশও করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম মাজেদ ও উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকারের সই করা গত ৩০ আগস্টের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়। এর আগে ১৯ আগস্ট তারা সরেজমিনে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ পরিদর্শন করে অভিযোগের তদন্ত করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যক্ষের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র সাত দিন আগে মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট রেগুলেশনের ১৫(ক)(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক তিন মাসের সময়সীমা রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দিলেও চাকরিকালীন প্রমাণিত অনিয়মের কারণে ওই বর্ধিত মেয়াদ বাতিলযোগ্য বলে তদন্ত কর্মকর্তারা মত দেন।
প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রেগুলেশনের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের ন্যূনতম শর্ত—গভর্নিং বডির লিখিত অনুমোদন ও আট বছরের লিখিত চুক্তি—পূরণ না হওয়ায় তার ছুটি অননুমোদিত। পাশাপাশি ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্তি ও কারাবন্দী অবস্থায় বেতন উত্তোলন রেগুলেশনের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন এবং স্বতন্ত্রভাবে বরখাস্তযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়।
এ কারণে অধ্যক্ষ আবুল কালাম জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সময়সীমা লঙ্ঘন ও অনিয়মের দায়ে রেগুলেশনের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবিলম্বে চূড়ান্ত বরখাস্ত এবং বিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন, অন্তত দুইবার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইএফটি ব্যবস্থায় বেআইনিভাবে উত্তোলিত বেতন সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে ফেরত নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর কারাগারে থেকেও ‘শিক্ষা ছুটি’র নামে বেতন উত্তোলন—দুটিই তদন্তে অনিয়ম হিসেবে পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় মতামতসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাউশিতে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরের নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাউশি, রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ বলেন, শুধু মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ নয়, যেকোনো কলেজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারাগারে থেকেও এমপিও সিটে নাম, বেতন উত্তোলন
তদন্তের সূত্র ধরে জানা যায়, মোহাম্মদ আলী বাবু কাউনিয়া উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের গধাদর গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে এবং মীরবাগ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।
তার বিরুদ্ধে হজে পাঠানোর কথা বলে অর্থ নেওয়া এবং চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নীলফামারীতে দুটি এবং রংপুরের আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে।
গত ১৫ মে রাতে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। পরে কাউনিয়া থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে রংপুর মহানগরীর একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ১৬ মে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই মাস কারাবন্দী থাকার পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারাগারে থাকলেও কলেজের এমপিও সিটে তার নাম তালিকাভুক্ত ছিল এবং মে, জুন ও জুলাই মাসের বেতনও দেওয়া হয়। তবে উপস্থিতি রেজিস্টারে ১০ মে থেকে তার নামের পাশে ‘শিক্ষা ছুটি’ উল্লেখ করা হয়।
এদিকে ২০২৪ সালে হজে পাঠানোর নামে ৭৫ জন হজযাত্রীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছিল। এর আগে ‘দিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ নামের হজ এজেন্সির পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও চিঠি দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে এখন মাউশির পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ।