বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। কোথাও ৯৩ জন শিক্ষার্থীর তথ্য সরকারি নথিতে থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত আসে মাত্র ৫ থেকে ৭ জন। কোথাও ৬৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার উত্তরপত্র পাওয়া গেছে মাত্র ২০টি। আবার ৬১ শিক্ষার্থীর তথ্য থাকা বিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৪০ জনেরও কম।
নীলফামারী সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এমন নানা অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তথ্যভান্ডার আইপিইএমআইএসে উপজেলার ২০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য, হাজিরা খাতা ও পরীক্ষার উত্তরপত্রের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই এর মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় আইপিইএমআইএসে বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে শিক্ষার্থীর ভিত্তিতে দেওয়া সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থীর তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের।
নথিতে ৯৩, নিয়মিত শিক্ষার্থী ৫–৭ জন?
অনুসন্ধানে সদর উপজেলার চওড়া বড়গাছা ক্লাস্টারের কিসামত দলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। আইপিইএমআইএসে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৯৩ জন।
স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে মাত্র ৫ থেকে ৭ জন শিক্ষার্থী। এমনকি দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় পাশের একটি ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষার্থীদের এনে পরীক্ষা দেওয়ানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে—বিদ্যালয়ে যদি নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত কম হয়, তাহলে সরকারি তথ্যভান্ডারে ৯৩ শিক্ষার্থীর তথ্য কীভাবে এলো? এই সংখ্যার ভিত্তিতে বিদ্যালয়টি কী পরিমাণ সরকারি সুবিধা বা বরাদ্দ পেয়েছে, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

৬৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে উত্তরপত্র ২০টি
নতুন বাজার ক্লাস্টারের কালিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। আইপিইএমআইএসে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৮ জন। অথচ দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার উত্তরপত্র পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থীর খাতা।
একইভাবে রামগঞ্জ ক্লাস্টারের ৩৪ নম্বর শালমারা গোড়ক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৬১ জন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় ৪০ জনেরও কম শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে।
নতুন বাজার ক্লাস্টারের ইটাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী ৭৫ জন দেখানো হলেও বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন উপস্থিতি এর তুলনায় প্রায় অর্ধেক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সরকারি তথ্যভান্ডারের সংখ্যা, বাস্তব উপস্থিতি এবং পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
শিক্ষার্থী বাড়লে বাড়ে বরাদ্দ
শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান—স্লিপসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বাস্তবে শিক্ষার্থী কম থাকার পরও যদি সরকারি নথিতে বেশি শিক্ষার্থী দেখানো হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত সংখ্যার ভিত্তিতে কোনো বিদ্যালয় বাড়তি সুবিধা বা বরাদ্দ পাচ্ছে কি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা দেখালে বিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমে যেতে পারে। এতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে শিক্ষার্থী বাড়িয়ে দেখানোর বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা তাদের দেখাতে পারেননি তারা।
কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শিক্ষার্থী সংখ্যার এসব অসঙ্গতির বিষয়টি জানেন। তবে কর্মকর্তাদের পরামর্শে তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগের পক্ষেও প্রতিবেদকের হাতে কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশ্নপত্র ছাপার খরচ নিয়েও প্রশ্ন
শুধু শিক্ষার্থী সংখ্যার হিসাব নয়, মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানোর ব্যয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীপ্রতি ১৫ টাকা এবং দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীপ্রতি ১৩ টাকা হারে অর্থ নেওয়া হয়েছে। আইপিইএমআইএসে দেখানো প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীকে ভিত্তি ধরলে দুই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য মোট অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকটি ছাপাখানার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশ্নপত্রের প্রকৃত সংখ্যা, পৃষ্ঠা ও কাগজের মানের ওপর ব্যয় নির্ভর করলেও একই পরিমাণ প্রশ্নপত্র ছাপাতে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার মতো খরচ হতে পারে।
তাহলে প্রশ্নপত্র ছাপাতে যদি প্রায় ৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে থাকে, অতিরিক্ত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন কোটেশন, কার্যাদেশ, ছাপাখানার বিল-ভাউচার, প্রশ্নপত্রের প্রকৃত সংখ্যা এবং অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দায় ঠেলাঠেলি
অভিযোগের বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাছিজুল আলম মন্ডল বলেন, আইপিইএমআইএসের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব শিক্ষার্থীর সংখ্যা না মিললে এর দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের। কারণ শিক্ষার্থীর তথ্য তারাই দেন।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা পরিচালনার জন্য কমিটি করা হয়েছে এবং প্রশ্নপত্র ছাপানোর ক্ষেত্রে কোটেশন নেওয়া হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, প্রশ্নপত্র বা পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কোনো সম্পৃক্ততা নেই; এটি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব। তিনি জানান, আইপিইএমআইএসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ব্র্যাক স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসার তথ্যও থাকার কথা।
একই এলাকায় নতুন কিন্ডারগার্টেনের অনুমোদন
এদিকে নীলফামারী জেলায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সুপারিশে নতুন করে ৫৮টি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলায় রয়েছে ২১টি।
এ নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন—যেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অনেকটিতেই শিক্ষার্থী সংকট রয়েছে, সেখানে একই এলাকায় নতুন করে এতগুলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন শিক্ষার্থী সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না।
তদন্তই দিতে পারে প্রকৃত চিত্র
নীলফামারী সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা কত, আইপিইএমআইএসে কত দেখানো হয়েছে এবং সেই সংখ্যার ভিত্তিতে গত কয়েক বছরে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—তা যাচাই করা এখন জরুরি।
একই সঙ্গে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ভর্তি রেজিস্টার, হাজিরা খাতা, আইপিইএমআইএসের তথ্য, পরীক্ষার উপস্থিতি ও উত্তরপত্র এবং স্লিপ বরাদ্দের হিসাব মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে কিসামত দলুয়া, কালিদাস, শালমারা গোড়ক পাড়া ও ইটাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ছাপানোর কোটেশন, কার্যাদেশ ও বিল-ভাউচার নিরীক্ষা করা হলে অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হবে।
শিক্ষার্থী নেই, অথচ সরকারি নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে—এটি নিছক তথ্যগত ভুল, নাকি এর সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে—তার নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।