অভাবের সংসার, থাকার মতো নিজস্ব ঘর নেই। বাবা দিনমজুর। প্রতিদিন স্কুলে যেতে পাড়ি দিতে হয়েছে পাঁচ কিলোমিটার পথ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল ছাড়েনি মোছা. জুলেখা খাতুন। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। তবে সাফল্যের পরও উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় জুলেখা ও তার পরিবার।
জুলেখা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের লক্ষণপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। তার বাবা মো. জাহির উদ্দীন একজন দিনমজুর। সংসারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। নিজেদের কোনো বাড়িঘর বা জমি নেই। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধের জেরে বসতভিটা ছাড়তে হয়েছে পরিবারটিকে। বর্তমানে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বালাডাঙ্গা গ্রামে এক চাচার জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছে তারা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সরেজমিনে জুলেখাদের বাড়িতে গেলে কথা হয় তার মা শেফালি বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, বনিবনা না হওয়ায় জুলেখার বড় ভাই তাদের ঘর থেকে বের করে দেন। পরে প্রতিবেশী দেবরের জায়গায় ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। অনেক কষ্টে জুলেখার বড় দুই বোনের বিয়ে দিয়েছেন। এখন বৃদ্ধ স্বামীকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
জুলেখা জানায়, তার বাবা অন্যের কৃষিজমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালান। অনেক দিন কাজ না থাকলে অভাবের কারণে তাঁদের না খেয়েও থাকতে হয়েছে। তবে পরীক্ষার সময় প্রতিবেশী এক চাচির সহায়তায় খাবারের কষ্ট কিছুটা কমেছিল।
স্কুলে যাতায়াতের বিষয়ে জুলেখা বলে, বাড়ি থেকে বিদ্যালয় অনেক দূরে। বৃত্তির টাকা জমিয়ে একটি সাইকেল কিনেছিল। সেই সাইকেলে প্রতিদিন পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেত সে।
জুলেখা জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই লক্ষণপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিনা বেতনে পড়াশোনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। শ্রেণিশিক্ষক রেহেনা বেগমসহ অন্য শিক্ষকরাও পড়াশোনায় তাকে সহায়তা ও উৎসাহ দিয়েছেন।
শ্রেণিশিক্ষক রেহেনা বেগম বলেন, জুলেখা লেখাপড়ার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। সে প্রায়ই বলত, ‘বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে চাই।’ ভালো ফলাফল করে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নও রয়েছে তার।
লক্ষণপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, জুলেখার ভালো ফলাফলের পেছনে মূল কৃতিত্ব তার নিজের। অভাব-অনটনের মধ্যেও রাত জেগে, কখনো না খেয়ে পড়াশোনা করেছে মেয়েটি। তার উচ্চশিক্ষার পথে যেন কোনো বাধা না আসে, সেজন্য সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন তিনি।
দারিদ্র্যকে জয় করে জিপিএ-৫ অর্জন করলেও জুলেখার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাবে কে?