শিরোনাম

চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন নীলফামারীর মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য

চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন নীলফামারীর মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য

নীলফামারীর নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ বা রিং জাল। সহজলভ্য ও কম দামের এই জালের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে জলজ জীববৈচিত্র্য। প্রশাসনের অভিযান চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় অবৈধ এই জালের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

স্থানীয়ভাবে ‘চায়না দুয়ারি’, ‘রিং জাল’ বা ‘ম্যাজিক জাল’ নামে পরিচিত এ জাল লোহার রিং দিয়ে খোপ আকারে তৈরি করা হয়। চারপাশে সূক্ষ্ম জাল থাকায় ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের মাছ সহজেই এতে আটকা পড়ে। ক্ষুদ্র ফাঁসের কারণে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীও রক্ষা পায় না।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জালের কারণে পুঁটি, খলিশা, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, টাকি, চিংড়ি, মলা, ঢেলা, পাবদা, শোল, বৈরালী, কাজলীসহ অসংখ্য দেশীয় মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কাঁকড়া, কুঁচিয়া, ব্যাঙ, কচ্ছপ, ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আকার ও মানভেদে একটি চায়না দুয়ারি জালের দাম দুই থেকে ১০ হাজার টাকা। কম দামে সহজে পাওয়া যাওয়ায় নীলফামারীর বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যে এসব জাল বিক্রি হচ্ছে। ঢেলাপীর, মীরগঞ্জ, ট্যাংগনমারী, খেরকেটি, টেপারহাট, নাউতারা, রাজিব ও শৈলমারী আদর্শবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এ জালের বেচাকেনা চলছে। এছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও গোপনে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব জাল পৌঁছে যাচ্ছে।

জেলার তিস্তা, বুড়িতিস্তা, চাড়ালকাটা, বুড়িখোড়া, ধুম, বামনডাঙ্গা, পাঙ্গা, কুমলাই, নাউতারা, যমুনেশ্বরী, ইছামতি, খড়খড়িয়া, ধাইজান ও চিকলী নদীসহ অসংখ্য বিল ও জলাশয়ে শত শত চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ময়েজ উদ্দিন বলেন, “একসময় নদী-খাল-বিলে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল। চায়না জালের কারণে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।”

কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাফলা গ্রামের আফছার আলী বাদাউ বলেন, “প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ এই জালে ধরা পড়ায় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় সংকট দেখা দেবে।”

জলঢাকা উপজেলার রাজারহাট গ্রামের মঞ্জুর রহমান বলেন, “এমন কোনো মাছ নেই, যা এই জালে ধরা পড়ে না। নতুন পানিতে মা মাছ ডিম ছাড়ার আগেই আটকা পড়ছে।”

বাফলা বিল এলাকার শিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, “শুধু অভিযান নয়, মানুষকে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে এসব জালের উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বরুণ কুমার মণ্ডল বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যক্তি চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি জানান, জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জ উপজেলার মধ্যরাজিব এলাকার একটি কারখানা থেকে প্রায় ৮০০টি চায়না দুয়ারি জাল এবং জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও প্রায় ৬০০টি ক্ষতিকর জাল জব্দ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, গত ১৯ জুলাই জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সভায় চায়না দুয়ারি জালের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চার দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ জাল উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর