সুন্দরবনে প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে দেখা দেয় আয়সংকট। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহসহ বনকেন্দ্রিক নানা পেশায় যুক্ত পুরুষ সদস্যদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ঋণের কিস্তি সামলাতে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয় নারীদের। চিংড়ি ঘের থেকে শুরু করে বিভিন্ন কায়িক শ্রমে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয়ের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা আলেয়া বেগমের স্বামী সুন্দরবনে মাছ ধরেন। বন বন্ধ থাকলে স্বামীর আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। তখন সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে তাঁকে অন্যের চিংড়ি ঘেরে শ্রম দিতে হয়।
আলেয়া বেগম বলেন, “বন বন্ধ থাকলে সংসারে আয় থাকে না। তখন বাধ্য হয়ে ঘেরে কাজ করতে হয়। কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে?”
শুধু আলেয়া নন, সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরার অসংখ্য পরিবারের চিত্র এখন অনেকটা একই। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে জীববৈচিত্র্য ও প্রজনন রক্ষায় সুন্দরবনে প্রবেশ এবং সম্পদ আহরণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরিবেশ ও বন রক্ষায় এ নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সময়ে বননির্ভর মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ কতটা তৈরি হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বন বন্ধ, বন্ধ হয়ে যায় আয়ের পথ
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লাখের বেশি মানুষ সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পেশায় যুক্ত থাকায় এসব মানুষের অনেকেরই অন্য কোনো পেশায় কাজের অভিজ্ঞতা নেই। স্থানীয় পর্যায়েও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে কেউ দূরের এলাকায় কাজের সন্ধানে যান, আবার কেউ কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে থাকেন।
বনজীবী আইয়ূব আলী বলেন, সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ থাকায় বহু পুরুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরিবারের খাবার জোগাতে তখন নারীদেরই শ্রম বিক্রি করতে হয়।
ভেটখালী গ্রামের শরিফা খাতুনের পরিবারেও একই চিত্র। তাঁর স্বামী বন বন্ধ থাকায় কাজে যেতে পারেন না। তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসারের খরচ চালাতে তাঁকেই অন্যের মাছের ঘেরে কাজ করতে হচ্ছে।
শরিফা বলেন, “যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলছে। স্বামী কাজ করতে না পারলে সংসারের দায়িত্ব তো কাউকে নিতেই হবে।”
নারীর শ্রমে সচল সংসার, মজুরি নিয়ে অভিযোগ
সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞার সময়ে নারীরা চিংড়ি ঘের, কৃষিকাজ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হলেও তাদের মজুরি নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। একই ধরনের কাজ করেও পুরুষের তুলনায় নারীরা কম পারিশ্রমিক পান বলে দাবি শ্রমজীবী নারীদের।
উপকূলীয় বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শেফালী বেগম বলেন, “বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া উপকূলের এই সংকট দূর করা কঠিন। একই সঙ্গে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।”
অর্থাৎ, বন বন্ধের সময় একদিকে যেমন পুরুষের আয় কমে যায়, অন্যদিকে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশ বাড়ে। কিন্তু সেই শ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সংকট পুরোপুরি কাটে না।
খাদ্য সহায়তা মিললেও কাটে না সংকট
নিষেধাজ্ঞার সময়ে বনজীবীদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সহায়তা একটি পরিবারের পুরো মাসের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
বনজীবীদের অভিযোগ, প্রকৃত পেশাজীবীদের একটি অংশ সরকারি তালিকার বাইরে থাকায় তারা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তালিকাভুক্তি ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন জটিলতা ও তদবিরের অভিযোগ রয়েছে।
জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে, সাতক্ষীরায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজার। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত জেলের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। ফলে অনেকে সরকারি সহায়তার আওতায় আসছেন না।
ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাবারের সংকট সামাল দিতে অনেক পরিবারকে ঋণ করতে হয়। এ সুযোগে দাদনদাতা ও মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকে।
স্থানীয় সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, বিকল্প কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় বহু বনজীবী পরিবার দাদন ও মহাজনী ঋণের চক্রে আটকে পড়ছে। বননির্ভরতা কমাতে প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকার উদ্যোগ থাকলেও এর সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনে আরও সংকুচিত হচ্ছে বিকল্প জীবিকা
সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের সংকট শুধু সুন্দরবন বন্ধ থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বননির্ভর পরিবারগুলোর ওপর।
ফলে সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞার সময় বনজীবী পরিবারগুলোর সামনে বিকল্প আয়ের পথ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত বলেন, শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে একটি পরিবারের সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা এবং স্থানীয়ভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা মৎস্য কর্মকর্তা গাজী মো. সেলিম বলেন, প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্তি এবং বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা ফজলুল রহমান বলেন, প্রকৃত বনজীবীদের চিহ্নিত করতে বন বিভাগের বিএলসি-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা হলে সহায়তা বিতরণ আরও কার্যকর হতে পারে। বননির্ভরতা কমাতে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প জীবিকার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, কিন্তু বিকল্প জীবিকাও জরুরি
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রবেশ ও সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার আর্থিক চাপ যদি পুরোপুরি বনজীবী পরিবারগুলোর ওপর পড়ে, তাহলে তারা জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ বা অননুমোদিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়, নিষেধাজ্ঞার সময় বননির্ভর মানুষের জীবিকা কীভাবে সচল রাখা যায়, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত বনজীবীদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
সুন্দরবন রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও রক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ বন বাঁচানোর দায়িত্ব যাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, সেই মানুষগুলোর জীবিকা নিরাপদ না হলে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবন সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।