একদিকে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদীর তীর রক্ষায় ফেলা হয়েছে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব। অন্যদিকে সেই প্রতিরক্ষা বাঁধের মাত্র কয়েক শ ফুটের মধ্যে নদীর তলদেশে বসানো হয়েছে সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন। পাইপের মাধ্যমে দিন-রাত তোলা হচ্ছে বালু।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন তিস্তা নদীতে এভাবে বালু উত্তোলন চলছে। পরে সেই বালু বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু তুলে গভীরতা সৃষ্টি করা হলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে নদীতীরের ওপর চাপ বাড়তে পারে। এতে হুমকিতে পড়তে পারে সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধ, পাশাপাশি আবাদি জমি ও বসতভিটাও।
বাঁধের পাশে মেশিন, দিন-রাত চলছে বালু তোলা
সরেজমিনে দেখা যায়, ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট পশ্চিমে বটতলী এলাকায় তিস্তা নদীতে একটি সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন বসানো হয়েছে। মেশিনের সঙ্গে পাইপ সংযোগ করে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, দিনের পাশাপাশি রাতেও মেশিন চালিয়ে বালু তোলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
প্রশ্ন উঠেছে, নদীভাঙন ঠেকাতে যেখানে সরকারি অর্থে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, সেই স্থাপনার এত কাছেই কীভাবে বালু উত্তোলনের মেশিন বসানো হলো? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগে থেকে জানত কি না, জানলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
‘বসতভিটা উঁচু’র কথা, বালু যাচ্ছে বিক্রি করতে
স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতভিটা উঁচু করার কথা বলে নদী থেকে বালু তোলা হলেও পরে তা বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ভাকু ও তাঁর লোকজন এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রবিউল ইসলাম ভাকু বলেন, ‘ভাঙনের ফলে নদের মধ্যে আমাদেরও অনেক জমি আছে। সেই জমি ভরাট হওয়ায় সেখান থেকে বালু উত্তোলন করছি।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, উত্তোলিত বালু শুধু জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে না; বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রিও করা হচ্ছে।
ভাঙনে জমি হারাচ্ছেন কৃষকরা
তিস্তার ভাঙন ছোটখাতা এলাকার মানুষের জন্য নতুন কোনো সংকট নয়। এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু আবাদি জমি ও বসতভিটা।
চলতি বন্যায় কৃষক রহিজ উদ্দিনের প্রায় ২৫ শতাংশ আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে তাঁর ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে।
রহিজ উদ্দিন বলেন, ‘এখন ৫০ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে একসময় আমাদের আবাদি জমি হয়তো আর থাকবে না।’
একই এলাকার কৃষক গেদা মাহমুদের ৩৫ শতাংশ আবাদি জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন বসতভিটাও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল, লিয়াকত হোসেন ও বেল্লাল বলেন, নদীভাঙনে মানুষ এমনিতেই জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছে। এর মধ্যে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাঁদের ভাষ্য, ‘ব্যক্তি মুনাফার জন্য নদী ও পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে।’

কোটি টাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ?
তিস্তার ভাঙন থেকে নদীতীরবর্তী গ্রাম, আবাদি জমি ও বসতভিটা রক্ষায় ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপন করেছে।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো নদীর স্রোত ও ভাঙনের প্রভাব কমিয়ে তীর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা।
কিন্তু সেই প্রতিরক্ষা বাঁধের কাছাকাছি নদীর তলদেশ থেকে যদি নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে কৃত্রিম গভীরতা তৈরি হলে স্রোতের গতিপথ বদলে যেতে পারে। এতে বাঁধের পাদদেশ ও নদীতীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ভাঙন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণী, ফসলি জমি বা উদ্ভিদের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন, সেচ বা নদীভাঙন রোধে নির্মিত অবকাঠামোর সংলগ্ন এলাকা থেকেও বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। বাঁধ, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, সড়ক, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা আবাসিক এলাকার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ।
অর্থাৎ ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি শুধু পরিবেশগত নয়, আইনগত দিক থেকেও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসন বলছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে
অভিযোগের বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘তিস্তা নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এখন প্রশ্ন তদন্তের
তিস্তার তলদেশ থেকে ঠিক কতদিন ধরে বালু উত্তোলন হচ্ছে, প্রতিদিন কী পরিমাণ বালু তোলা হচ্ছে, উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে নদীভাঙন ঠেকাতে সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হচ্ছে, সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাত্র কয়েক শ ফুট দূরেই যদি নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলা হয়, তাহলে ভাঙন ঠেকানোর সরকারি উদ্যোগ কতটা টেকসই হবে?
নদী ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব এবং সরকারি অবকাঠামোর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু বালু উত্তোলন বন্ধ নয়, এর পেছনে থাকা ব্যক্তি ও নেপথ্য মদদদাতাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁদের।