সাতক্ষীরা জেলায় সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি হলেও উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরে এখনো বহু শিশু শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, জীবিকার অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত সংকটের কারণে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন থমকে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে ‘ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা’ নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও উপকূলের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আয়োজনে সকালে জেলা কালেক্টরেট চত্বর থেকে র্যালি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, সাক্ষরতা শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জীবনমুখী, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝরে পড়া শিশু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনতে সাক্ষরতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মোজাফ্ফর উদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবিরসহ শিক্ষা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
৭৫ শতাংশ সাক্ষরতার আড়ালে উপকূলের বাস্তবতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাতক্ষীরা জেলায় সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং নারীর ৭১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তবে জেলার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনির বিভিন্ন এলাকায় এখনো বহু শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এসব এলাকার বহু পরিবারের জীবিকা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি আহরণ, কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের আয় কমে গেলে অনেক সময় শিশুদেরও কাজে যুক্ত করা হয়।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের মাদ্রাসাশিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, দারিদ্র্যের চাপে অনেক শিশুই লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ছুটতে বাধ্য হচ্ছে। পরিবারের আয় কমে গেলে শিশুদেরও কাজে লাগাচ্ছেন অসচেতন অভিভাবকেরা।
স্থানীয় এনজিওকর্মী পিযুষ বাওয়াল বলেন, শ্যামনগরে দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং বাল্যবিয়ের বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠেছে।
নেই হালনাগাদ তথ্য
শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে উপজেলার ৪৬টি স্কুল, ৩৬টি মাদ্রাসা ও তিনটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৫ হাজার ৬৫৭ জন। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের কতজন শিক্ষাজীবন ধরে রাখতে পেরেছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ ও ইউনিয়নভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ তথ্য জানতে শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরমোহাম্মদ তেজারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অসুস্থতার কারণে তিনি তথ্য দিতে পারেননি।
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
২২ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে ২০২১ সালে সাতক্ষীরায় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম’ চালু হয়। এ প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া, আশাশুনি, দেবহাটা ও কালিগঞ্জ—এই ছয় উপজেলায় ৪২০টি শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা হয়।
প্রতিটি কেন্দ্রে ৩০ জন করে মোট ১২ হাজার ৬০০ শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ দিয়ে পুনরায় মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনাই ছিল প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। কর্মজীবী শিশুদের কথা বিবেচনায় নিয়ে অনেক কেন্দ্রে সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ ওঠে। শিক্ষকদের কয়েক মাস বেতন না দেওয়া, শিক্ষা উপকরণ বিতরণে অনিয়ম, কেন্দ্র ভাড়ায় অসঙ্গতি এবং ভুয়া শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির অভিযোগও ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার পরিচালক ইমান আরী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ছয়টি উপজেলাকে নিরক্ষরমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মাঝপথে জেলা প্রশাসন প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ায় তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
তৎকালীন জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০ হলেও প্রকল্পের আওতাধীন কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী দেখানোর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবির ২০২৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়ে তা বন্ধের সুপারিশ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
.jpeg)
শ্যামনগর বাদ কেন?
প্রকল্পের আওতায় ছয়টি উপজেলায় ৪২০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালিত হলেও সেই তালিকায় উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ছিল না। অথচ বর্তমানে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের কারণে শ্যামনগরে শিশুদের ঝরে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী জিএম মুজিবর রহমান বলেন, বিপুল অর্থের প্রকল্পের মাধ্যমে কতজন শিশু প্রকৃতপক্ষে সাক্ষরতার আওতায় এসেছে, তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। ছয় উপজেলার ৪২০টি কেন্দ্রের তালিকায় শ্যামনগর না থাকাও প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ
সাতক্ষীরা জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মোজাফ্ফর উদ্দিন বলেন, তিনি ওই সময় কর্মস্থলে ছিলেন না। ফলে তৎকালীন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তার জানা নেই।
তিনি বলেন, উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর আগের প্রকল্পে বাদ পড়েছিল। এবার শ্যামনগরকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এর কার্যক্রম শুরু হবে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় এ উপজেলাকে নিরক্ষরমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্কুল ফিডিংয়ে ঝরে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা
শ্যামনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে ২০২৫ সাল থেকে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হয়েছে। এর আওতায় শিশুদের পুষ্টিকর বিস্কুট, ইউএইচটি মিল্ক, পাকাকলা, বন্ড রুটি ও সিদ্ধ ডিম দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন দুই ধরনের খাবার সরবরাহ করা হয়।
তার দাবি, এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১৯১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২৬ হাজার শিশু শিক্ষার্থী সুবিধা পাচ্ছে। পুষ্টি সহায়তার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো ও ঝরে পড়া কমানোও এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে কর্মসূচির প্রকৃত প্রভাব নিরূপণে এর আগে ও পরে বিদ্যালয়ভিত্তিক উপস্থিতি, অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়ার তথ্য তুলনা করার দাবি জানিয়েছেন শ্যামনগরের বাসিন্দা প্রভাষক সামিউল মনির।
শুধু সাক্ষরতার হার দিয়ে সাফল্য নয়
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে ঝরে পড়া শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাতক্ষীরায় সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি হলেও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটি জানা জরুরি।
তার মতে, প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুর তালিকা, বয়স, পরিবারের আর্থিক অবস্থা, ঝরে পড়ার কারণ এবং তাদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফেরানোর অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও জলবায়ুজনিত সংকট বিবেচনায় নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা দরকার।
তিনি বলেন, সাক্ষরতার সাফল্য শুধু কতজন মানুষ পড়তে ও লিখতে পারে তার হিসাব নয়; কত শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, কতজন শিক্ষাজীবনে টিকে থাকছে এবং ঝরে পড়ার পর কতজনকে আবার শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে—সেই হিসাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের আয়োজন তাই সাতক্ষীরার সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—জেলার সাক্ষরতার হার বাড়লেও উপকূলের ঝরে পড়া শিশুদের কতজন সত্যিই শিক্ষার আলোয় ফিরছে?