কারাগারে থাকা অবস্থায় শিক্ষা ছুটির নামে বেতন উত্তোলনের অভিযোগে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। একই সঙ্গে কলেজটির অধ্যক্ষ আবুল কালাম জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিতে অনিয়মের অভিযোগও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) মাউশি রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ ও উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার সরেজমিনে কলেজ পরিদর্শন করে অভিযোগগুলোর তদন্ত করেন। প্রাথমিক তদন্তে শিক্ষক ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মাউশির উপপরিচালক কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু দীর্ঘদিন কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তাঁর শিক্ষা ছুটির আবেদন ও অনুমোদনও যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। এরপরও তাঁকে শিক্ষা ছুটির নামে বেতন দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে আসে, গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যক্ষ আবুল কালাম জয়নুল আবেদীনের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। তবে প্রায় ছয় মাস পর, চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠির মাধ্যমে তাঁর চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ছয় মাস তিনি কীভাবে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সে বিষয়ে তাঁর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু ও অধ্যক্ষ আবুল কালাম জয়নুল আবেদীনের অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
মাউশি রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ বলেন, যেকোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তারা বদ্ধপরিকর। কেউ অনিয়ম বা দুর্নীতি করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হজে লোক পাঠানো ও চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালে হজে পাঠানোর নামে ৭৫ জন হজযাত্রীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।

এর আগে হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে দিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের হজ এজেন্সির পরিচালক মোহাম্মদ আলী বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে নীলফামারী থেকে বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকে। সর্বশেষ গত ১৫ মে রাতে রংপুর মহানগরীর একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে থাকার সময়ও কলেজের এমপিও সিটে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত ছিল এবং মে, জুন ও জুলাই মাসের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। কলেজের উপস্থিতি রেজিস্টারে অবশ্য ১০ মে থেকে তাঁর নামের পাশে ‘শিক্ষা ছুটি’ উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘদিন কলেজে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে অধ্যক্ষ আবুল কালাম জয়নুল আবেদীন বলেন, মোহাম্মদ আলী বাবুর শিক্ষা ছুটির অনুমোদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। এটি তাঁর ভুল হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ আলী বাবু বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সভায় তাঁর শিক্ষা ছুটি অনুমোদন করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্র রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ভালো বলতে পারবেন বলে জানান।
এদিকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সেকেন্দার আলী বলেন, সভায় প্রাথমিকভাবে শিক্ষা ছুটির বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাবু এসব কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
মাউশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।