শিরোনাম

বিএনপির রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল

বিএনপির রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার প্রেক্ষাপটে দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মির্জা ফখরুল। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে ভোট ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিহিত করা যাবে না। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে প্রবল বলে মনে করা হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। পারিবারিকভাবে রাজনীতির পরিবেশে বেড়ে উঠলেও ছাত্রজীবন থেকেই নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেন মির্জা ফখরুল।

ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ষাটের দশকের শেষভাগের ছাত্র আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

শিক্ষকতা থেকে সরকারি চাকরি

শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরেও কাজ করেন।

পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৯ সালের শেষদিকে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পর তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান।

সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি।

১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদে উন্নীত হন।

সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

বিএনপির মহাসচিব

মির্জা ফখরুলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান ঘটে ধাপে ধাপে। ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়।

প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থাকার পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলের প্রধান সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দেশে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিরোধী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার নয়াপল্টনে সংঘর্ষের পরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আন্দোলনের মাঠে দৃশ্যমান নেতৃত্ব

দীর্ঘ সরকারবিরোধী আন্দোলনে মির্জা ফখরুল ছিলেন বিএনপির অন্যতম দৃশ্যমান নেতা। সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, জোটের সঙ্গে আলোচনা এবং দলীয় কর্মসূচি ঘোষণায় তিনি নিয়মিত সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও বিরোধী দলের কঠিন সময়েও দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকলেও নিজেকে বরাবরই মাঠের রাজনীতির নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন মির্জা ফখরুল।

২০২৬ সালে নতুন অধ্যায়

২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন।

এরপর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ১৩ আগস্ট বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করে।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই, ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে।

ব্যক্তিজীবন

ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক এবং পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশ—দুই সময়েই জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে মির্জা ফখরুলের নিজস্ব রাজনৈতিক উত্থান হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল ও সাংগঠনিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে।

বঙ্গভবনের পথে দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা

ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে দায়িত্ব, পৌর রাজনীতি, বিএনপির তৃণমূল নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দলের মহাসচিবের দায়িত্বে পৌঁছেছেন মির্জা ফখরুল।

এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন তার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্বের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে বঙ্গভবনে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক পথ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। আগামী ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত করবে—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন কি না।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর