শিরোনাম
জ্বালানি খরচ বাড়ায় চাপে আমদানি-রপ্তানি

ভোমরা বন্দরে কমেছে ট্রাক, রাজস্ব ঘাটতি ৯৫১ কোটি টাকা

ভোমরা বন্দরে কমেছে ট্রাক, রাজস্ব ঘাটতি ৯৫১ কোটি টাকা

একসময় প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০টি পণ্যবাহী ট্রাকের আনাগোনায় সরগরম থাকত সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আমদানি-রপ্তানি কমায় বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমেছে, কমেছে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজও। এর মধ্যে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে চাপের মধ্যে পড়েছেন বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক ও শ্রমজীবী মানুষ।

ভোমরা স্থলবন্দর কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ১৫ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট দিনে ভারত থেকে ১ হাজার ৪৫১টি পণ্যবাহী ট্রাক ভোমরা বন্দরে এসেছে। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮১টি ট্রাক এসেছে। ২২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত আরও প্রায় ১২০টি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল।

তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কয়েক বছর আগের তুলনায় ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে প্রতিদিন ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক আসত।

ভোমরা স্থলবন্দর ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, বর্তমানে টমেটো, কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি ট্রাক আসে। সব ধরনের পণ্য মিলিয়ে সংখ্যা দেড়শ বা তার কিছু বেশি। তবে কয়েকটি কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় সাময়িকভাবে আমদানি কিছুটা বেড়েছে।

জ্বালানি খরচ বাড়ায় বেড়েছে ট্রাকভাড়া

বাণিজ্যে মন্দার মধ্যে নতুন করে পরিবহন খরচ বাড়িয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও বাড়ানো হয়েছে।

জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ভোমরা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের ট্রাকভাড়া বেড়েছে। চট্টগ্রামে আগে একটি পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ছিল ৩৭ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে ৪১ হাজার টাকা হয়েছে। ঢাকার ভাড়া ২৭ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। বগুড়ায় ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী, দিনাজপুর ও বরিশালসহ অন্যান্য রুটেও আগের তুলনায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে।

তাঁর দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানি করা পণ্যের দামেও পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তারাও এর চাপ অনুভব করতে পারেন।

এক বছরে আমদানি কমেছে ১.১০ লাখ টন

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানি কমেছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৫ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোমরা দিয়ে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৮২ হাজার ৭২২ টন।

অন্যদিকে রপ্তানিতে পতন হয়েছে আরও বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোমরা দিয়ে ভারতে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৯ টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ২৮ লাখ ৬ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি কমেছে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯০১ টন। রপ্তানি আয়ও কমেছে প্রায় ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।

রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৯৫১ কোটি টাকা

আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়েও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোমরা কাস্টম হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৪ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৮ টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভোমরা কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

তবে নতুন অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ইতিবাচক চিত্রও দেখা যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টে ভোমরা কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে গত অর্থবছরের মন্দার পর নতুন অর্থবছরে বাণিজ্যে কিছুটা গতি ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষিপণ্যে সাময়িক ব্যস্ততা

বর্তমানে টমেটো, কাঁচামরিচসহ কয়েকটি কৃষিপণ্যের আমদানিকে ঘিরে ভোমরা বন্দরে কিছুটা ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। দেশের বাজারে চাহিদা থাকায় ভারত থেকে এসব পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।

তবে পরিবহন ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই আমদানি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। দেশে নতুন কৃষিপণ্যের মৌসুম শুরু হলে স্থানীয় উৎপাদন বাজারে আসবে। তখন ভারত থেকে টমেটো ও কাঁচামরিচের আমদানি কমে যেতে পারে। এতে বন্দরে ট্রাকের চাপও আবার কমার আশঙ্কা রয়েছে।

কাজ কমেছে শ্রমিকদের

আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষ। পণ্য ওঠানো-নামানো, ট্রাক থেকে পণ্য খালাস, গুদাম ও পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত শ্রমিকদের আয় নির্ভর করে বন্দরের বাণিজ্যের ওপর।

ভোমরা বন্দরের দুটি শ্রমিক সংগঠনের হিসাবে, বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার। ট্রাকের সংখ্যা ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ কমে যাওয়ায় তাঁদের একটি অংশ নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না।

শ্রমিক নেতা জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, আগে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০টি ট্রাক আসায় শ্রমিকদের কাজের সংকট ছিল না। এখন ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক কাজ না পেয়ে আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন।

বাণিজ্য কমার পেছনে নানা কারণ

সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী রামকৃষ্ণ চক্রবর্তীসহ একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ভোমরার বাণিজ্য কমে যাওয়ার পেছনে শুধু বাজার পরিস্থিতি দায়ী নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্যনীতি, বিভিন্ন পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ, এলসি খোলা ও ডলার সংকটসহ নানা বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। সীমান্ত বাণিজ্যের নিয়ম এবং পণ্যভিত্তিক নীতির পরিবর্তনেও আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ওঠানামা করছে।

ভোমরা কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুছা বলেন, দুই দেশের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সীমান্ত বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করে সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য ভোমরা বন্দরের অবকাঠামো এখনও প্রয়োজনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত ইয়ার্ড, আধুনিক গুদাম, ভারী পণ্য ওঠানো-নামানোর সরঞ্জাম এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে।

ভোমরা কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, তুলনামূলক বেশি শুল্ক পাওয়া যায় এমন কেমিক্যাল, ফেব্রিকস ও গার্মেন্টস-সংশ্লিষ্ট পণ্য আগের তুলনায় কম আসছে। পাশাপাশি বন্দরের কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

ভোমরা বন্দরের সাম্প্রতিক চিত্রে একদিকে গত অর্থবছরের বড় বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে নতুন অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আমদানি-রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই হবে না; বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্রুত পণ্য খালাস, কাস্টমস সেবা সহজীকরণ এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক জটিলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ভোমরায় বাণিজ্যের গতি কমলে তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর নয়, ট্রাকচালক, হেলপার, শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ কর্মী, গুদামকর্মীসহ বন্দরকেন্দ্রিক হাজারো মানুষের আয়েও পড়ে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর