এমপির ঘনিষ্ঠজন থেকে মামলার আসামি—সম্পর্ক, বিয়ে ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে একাধিক অভিযোগ
মো. মোজাফ্ফর রহমান, সাতক্ষীরা:
একসময় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন ওবায়দুর রহমান। পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। পরবর্তী সময়ে ওবায়দুর গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী ও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরবর্তীতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগ্নি মরিয়ম খাতুনের সম্পর্ক ও বিয়ে, তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং সর্বশেষ মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় ওবায়দুরের গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় আসে।
এসব ঘটনার মধ্যে ওবায়দুরের ভূমিকা নিয়ে মরিয়মের পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্য কয়েকজন বিভিন্ন অভিযোগ ও বক্তব্য দিয়েছেন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ তদন্তসাপেক্ষ।
পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে ঘনিষ্ঠতা
স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফার ভাষ্য, গাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। সেই পারিবারিক যোগাযোগের সূত্র ধরেই মাসুম বিল্লাহর শ্যালক ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে গাজী নজরুলের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
গোলাম মোস্তফার দাবি, পরবর্তীতে ওবায়দুর গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী ও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন।
তবে ওবায়দুর ঠিক কখন থেকে এমপির সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং তার দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক ধরন কী ছিল, সে বিষয়ে স্বাধীন কোনো নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
মরিয়মকে এমপির সঙ্গে পরিচয় করানোর অভিযোগ
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ সরাসরি অভিযোগ করেছেন, তার মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক তৈরির পেছনে ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ছিল।
মরিয়মের মরদেহ দাফনের জন্য শ্যামনগরের চৌদ্দরশি গ্রামে এসে প্রতিবেশীদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে মাসুম বিল্লাহ বলেন, “এই ওবায়দুরই আমার মেয়ের জীবনটা শেষ করে দিল।” তিনি ওবায়দুরের কঠোর শাস্তি দাবি করেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য বের করার দাবি জানান।
এটি মরিয়মের বাবার অভিযোগ; এর সত্যতা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
মরিয়মের চাচী মুন্নি খাতুন বলেন, ওবায়দুর ছিলেন মরিয়মের মামা এবং একই সময়ে গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহকারী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওবায়দুরের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে মরিয়মকে প্রথমবার গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিয়ে ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়া
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত জুনে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম খাতুনের বিয়ে হয়। এর পর জুলাইয়ে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
গাজী নজরুল ইসলামের চাচা আব্দুস সোবহানের দাবি, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর একটি পক্ষ গাজী নজরুলকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছিল।
আব্দুস সোবহান জানান, গত ২১ জুলাই ওবায়দুর রহমান গাজী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন।
তবে ব্যক্তিগত ভিডিওটি কার মাধ্যমে ছড়িয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মরিয়মের মৃত্যু ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা
গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এরপর মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা খাতুন এবং ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়েতে ওবায়দুরের ভূমিকার অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে। পরে চট্টগ্রাম থেকে ওবায়দুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এখানে উল্লেখ্য, মামলা হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
ওবায়দুরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমের অভিযোগ, ওবায়দুর একসময় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার আরও দাবি, গাজী নজরুল ইসলাম সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় ওবায়দুরের প্রভাব বাড়ে এবং তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে।
এগুলো ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমের বক্তব্য। এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো নির্দিষ্ট মামলার নথি বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
মরিয়মের মায়ের ভিডিও বক্তব্য
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরিয়মের মায়ের একটি ভিডিও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ের সময়কার বলে দাবি করা হলেও এর সময়কাল ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভিডিওতে মরিয়মের মা তার ভাই ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত অভিযোগ করেন। তার দাবি, ব্যবসার জন্য ওবায়দুরকে ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল এবং ওই অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে তিনি পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছেন। ভিডিওতে তিনি ওবায়দুরের শাস্তিও দাবি করেন।
এই বক্তব্যটি মরিয়মের মায়ের। ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট, বক্তব্যের সময়কাল এবং অর্থ লেনদেনের দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, তদন্তেই মিলবে উত্তর
শ্যামনগরের গাবুরার চৌদ্দরশি গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মাহফুজুর রহমান বাদশা বলেন, ওবায়দুরের গ্রেপ্তারের পর স্থানীয়দের মধ্যে তার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওবায়দুর কীভাবে গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন, মরিয়মের সঙ্গে এমপির সম্পর্ক ও বিয়েতে তার ভূমিকা কী ছিল এবং পরবর্তী বিরোধে তিনি কোনোভাবে জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
এখন তদন্তে মূলত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে—মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক কীভাবে শুরু হয়েছিল, বিয়েতে ওবায়দুরের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে আসামিদের কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি