শিরোনাম
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা

দুই আসামির স্বীকারোক্তিতেও কাটছে না রহস্য, ৬০ লাখ টাকা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের প্রশ্নে নতুন ধোঁয়াশা

দুই আসামির স্বীকারোক্তিতেও কাটছে না রহস্য, ৬০ লাখ টাকা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের প্রশ্নে নতুন ধোঁয়াশা

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী হত্যার ঘটনায় দুই আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পরও কাটছে না রহস্য। পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনায় ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া ও চিনে ফেলার আশঙ্কা থেকে হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হলেও ঘটনাস্থলের বিভিন্ন তথ্য, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয় এবং নিখোঁজ ৬০ লাখ টাকা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

রোববার রাতে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে কঠোর নিরাপত্তায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পুলিশ বলছে, আসামিরা পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যই আদালতে স্বীকার করেছেন।

তবে নিহত পরিবারের স্বজন ও স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু ইয়াবা সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলার আশঙ্কায় এত বড় হত্যাকাণ্ড ঘটানোর দাবি কতটা যৌক্তিক—তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পুলিশের বর্ণনায় যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেললে তাকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।

কিন্তু স্বজন ও স্থানীয়দের প্রশ্ন, ছাদের দরজা খোলার শব্দ বা পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি টের পাওয়ার পরও দুই যুবক কেন পালানোর চেষ্টা না করে একে একে চারজনকে হত্যা করল? চারজনকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সক্ষমতা ও সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি। হত্যাকাণ্ডের সময় বা তার আগে-পরে বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে বিচ্ছিন্ন হলো, কে বা কারা তা করেছিল—এ বিষয়টিরও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয় বলে স্বজনদের দাবি।

৬০ লাখ টাকা গেল কোথায়?

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে স্বর্ণালংকার নিয়েছে। কিন্তু নিহত পরিবারের স্বজনদের দাবি, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য গণপতি চক্রবর্তীর কাছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা থাকার কথা ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর সেই টাকার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

স্বজনদের প্রশ্ন, টাকা যদি সত্যিই বাসায় থাকে, তাহলে তা কোথায় গেল? আর যদি বাসায় না থাকে, তাহলে ওই অর্থের অবস্থান ও লেনদেনের বিষয়টি তদন্তে এসেছে কি না—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবিতে সোমবার দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা চলা অবরোধে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

নিহত গণপতি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ছেলে প্রীয়মও একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, হত্যাকাণ্ডের পর অল্প সময়ের মধ্যেই দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কীভাবে ঘটনার পুরো রহস্য উদঘাটনের দাবি করছে। তারা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না এবং এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

তদন্ত এখন ডিবিতে

রোববার নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, স্পর্শকাতর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হচ্ছে।

শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে প্রীয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও, ৬০ লাখ টাকার হদিস, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা, হত্যাকাণ্ডের সময়কাল, আসামিদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং সম্ভাব্য অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রশ্নের উত্তর না মিললে পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর