সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। এর মধ্যেই দেশীয় প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও নিজস্ব ডিজিটাল পরিসর তৈরির লক্ষ্য নিয়ে রংপুর থেকে যাত্রা শুরু করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ফ্রিডার’ পেয়েছে ব্যাপক সাড়া। নিখাদ খবরে ফ্রিডার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাত্র এক সপ্তাহে প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহারকারী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখে। প্রতিদিন নতুন করে নিবন্ধন করছেন প্রায় এক লাখ মানুষ।
ব্যবহারকারীর এই আকস্মিক বৃদ্ধিতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে যেমন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে সার্ভার সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ। পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় দ্রুত সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
‘স্বাধীনতা উপভোগ করুন ফ্রিডারের মধ্যে’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তাদের কাছে এটি শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; বরং বাংলাদেশিদের নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার একটি দেশীয় ডিজিটাল ঠিকানা। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারকারীর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের অর্থনৈতিক সুবিধার একটি অংশ দেশেই রাখা সম্ভব হবে।
ফ্রিডারের উদ্যোক্তা আখতারুজ্জামান বলেন, দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে আগ্রহ ও আস্থা তৈরি হয়েছে। এক বছরে এক লাখ ব্যবহারকারী পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নিখাদ খবরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ নতুন ব্যবহারকারী নিবন্ধন করছেন। ফলে একদিকে ব্যবহারকারীর ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে সার্ভারের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে করা যাচ্ছে না। নিজেদের মেধা, শ্রম ও অর্থ দিয়ে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা প্ল্যাটফর্মটি এখন বিপুল ব্যবহারকারীর চাপ সামলে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, ফ্রিডার শুধু রংপুরের একটি উদ্যোগ নয়, এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলতে পারে। তবে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। এসব প্ল্যাটফর্মের রয়েছে বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা।
তার মতে, ফ্রিডারকে টিকে থাকতে হলে ব্যবহারকারীর আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা, মানসম্মত কনটেন্ট ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে মোকাবিলা করা কঠিন। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ।
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম বলেন, নিখাদ খবরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের মাঠপর্যায়ের মার্কেটিং কার্যক্রম অনেকটাই থেমে গেছে। বর্তমানে নতুন করে প্রচারণার প্রয়োজন না থাকলেও সার্ভারের ধারণক্ষমতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। নতুন ব্যবহারকারীর চাপ সামাল দিতে না পারার আশঙ্কায় মাঠপর্যায়ে মার্কেটিং টিম পাঠাতেও তারা সতর্ক রয়েছেন। অথচ কর্মীদের নিয়মিত বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে, ফলে আর্থিক চাপও বাড়ছে।
উদ্যোক্তারা জানান, ফ্রিডারে ১৫০ টাকায় প্রোফাইল এবং ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশন সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি নামমাত্র খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপনের সুবিধা এবং এক হাজার ফলোয়ার হলেই মনিটাইজেশনের সুযোগ রয়েছে। তবে ব্যবহারকারীর বাড়তি চাহিদা পূরণে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট।
একদিকে প্রতিদিন প্রায় লাখো নতুন ব্যবহারকারী, অন্যদিকে সীমিত সার্ভার সক্ষমতা ও পুঁজির অভাব—এই দুই বাস্তবতার টানাপোড়েনে ফ্রিডারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত বিনিয়োগ না এলে ব্যবহারকারীদের বর্তমান আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা না পেলে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগটি মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপন ও অনলাইন লেনদেনের অর্থের একটি অংশ দেশীয় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ফ্রিডারের মতো উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের প্রযুক্তি খাত ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রংপুর থেকে শুরু হওয়া ফ্রিডার এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; এটি দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনারও পরীক্ষা। মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় ৬ লাখ ব্যবহারকারী যুক্ত হওয়া সেই সম্ভাবনার বড় প্রমাণ। তবে এই বিপুল সাড়া ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। সময়মতো বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে ফ্রিডার দেশের প্রযুক্তি খাতে একটি শক্তিশালী দেশীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।