শিরোনাম
সংকট কাটাতে সরকারের রোডম্যাপ

২০২৭-এ স্বস্তি, ২০৩০-এ সংকটমুক্তির লক্ষ্য

২০২৭-এ স্বস্তি, ২০৩০-এ সংকটমুক্তির লক্ষ্য

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের জন্য অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে সরকার। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সরকার জানিয়েছে, ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও স্বস্তি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকটমুক্ত পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

তবে বিরোধী দল বলেছে, বর্তমান সংকটের পেছনে অতীতের ভুলের পাশাপাশি সরকারের দুর্নীতি, সিদ্ধান্তহীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতিও দায়ী। সংকট মোকাবিলায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ‘সেল’ বা ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

সোমবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস-সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বিরোধী দলের পক্ষে বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান ও সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান।

‘ভোগান্তি এই সরকারের সৃষ্টি নয়’

আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এ সরকারের তৈরি নয়। তাঁর ভাষায়, বিগত ১৭ বছরের ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের সরকার পর্যাপ্ত গ্যাসের ব্যবস্থা না করেই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানেও যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব ব্যবস্থা আগের সরকার রেখে গেছে এবং বর্তমান সরকার তা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। বর্তমান সরকার কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাতারাতি কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। চুক্তি বাতিল করা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আন্তর্জাতিক সালিসে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে সংকটমুক্তির লক্ষ্য

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বিগত দিনের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি এবং ২০২৮ সালে আরও বেশি স্বস্তি পাওয়া যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকটমুক্ত পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বন্ধ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দ্রুত চালুরও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন এফএসআরইউ স্থাপন, এলএনজি আমদানি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ চলছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

সরকারি-বিরোধী দলের সমন্বিত ‘সেল’ চায় বিরোধী দল

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সব সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থে হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকার সহযোগিতা চাইলে বিরোধী দলের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা কোনো কৃতিত্ব চান না, বরং সমস্যার সমাধান চান।

সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ‘সেল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এটি স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিতভাবে কাজ করলে মানুষের আস্থা ফিরবে।

অতীতের সরকারকে শুধু দোষারোপ না করে বর্তমানেও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে না পারলে ভবিষ্যতেও নতুন দুষ্টচক্র তৈরি হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা না দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‘দয়া নয়, মানুষ বিল দেয়’

জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান বলেন, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট শুধু সক্ষমতার সমস্যা নয়; এর পেছনে দুর্নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পনা, সিদ্ধান্তহীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতিও রয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল দেয়, কর দেয়। তাই তাদের ঘরে বিদ্যুৎ ও চুলায় জ্বালানি থাকা কোনো দয়া নয়; এটি নাগরিকের অধিকার।

সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখা, অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে একটি ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠনেরও প্রস্তাব দেন নাজিবুর রহমান। একই সঙ্গে পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সমন্বিত সিদ্ধান্ত কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলেন তিনি।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের ওয়ার্কওভার দ্রুত শেষ, ভোলা, জামালপুর, লাকিগঞ্জ ও নোয়াখালীর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।

পাশাপাশি এলএনজি ও এফএসআরইউ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং জ্বালানি খাতে মালিকানা ও স্বার্থের সম্পর্ক প্রকাশের দাবি জানান নাজিবুর রহমান।

দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর অংশ ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর