শিরোনাম
ইসলামী ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬,৫০০ কোটি টাকার লাইফলাইন
ইসলামী ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬,৫০০ কোটি টাকার লাইফলাইন

তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে আরও ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (১৭ জুন) দেওয়া এ সহায়তাসহ গত তিন দিনে দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে মোট ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকটির চলমান তারল্য সংকট নিরসন এবং গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতেই এ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

গত কয়েক বছরে ঋণ অনিয়ম, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকটের কারণে ইসলামী ব্যাংক তীব্র তারল্য চাপে পড়ে। এর ফলে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন ও অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে।

এদিকে মঙ্গলবার ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। বৈঠক শেষে সংগঠনটির নেতারা সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন।

তাদের অন্যতম দাবি হলো, বিতর্কিতভাবে অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা গোষ্ঠীর হাতে থাকা ব্যাংকের শেয়ার আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অথবা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিক্রি করা। তাদের মতে, এতে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

গ্রাহক ফোরাম জানায়, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের বিষয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ আইন ও বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।

বৈঠকে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালে মালিকানা ও পরিচালনায় বড় পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার, ব্যাপক ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দীর্ঘদিনের অনিয়মের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এখনও তারল্য সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংক পুনর্গঠনে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ
ব্যাংক পুনর্গঠনে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ

খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাজেটে বড় বরাদ্দ। দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ, একীভূতকরণ এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ হিসেবে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী করতে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি জানান, খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একাধিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আইন ও নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরেই ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে সরকারের ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। তাই দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। নতুন এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ সরকার সরবরাহ করেছে।

এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত বা অবসায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার নতুন বরাদ্দকে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মূলধন জোগান নয়, সুশাসন, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারলেই ব্যাংকিং খাত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।