শিরোনাম
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক

নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জরুরি সভা

নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জরুরি সভা

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের নরসিংদী অংশে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। আজ রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেল ৪টায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভার নোটিশে ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং নরসিংদী জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভূমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক জটিলতা, ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ে ধীরগতি এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে নরসিংদী অংশে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

সওজের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০১ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে নরসিংদী অংশ প্রায় ৫২ কিলোমিটার। এ অংশে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য মোট আটটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি মামলার বিপরীতে অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা নিরসন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

‘সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়’ নিয়ে বিতর্ক

নরসিংদী অংশের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনায় রয়েছে সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমের দেওয়া একটি হিসাবও। তিনি দাবি করেছিলেন, নরসিংদী অংশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পুরো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ই প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে একটি জেলার অংশে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 

এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা, ক্ষোভ ও আন্দোলন হয়। এরপর তাকে তিন তিনবার বদলি করা হয়। নানা অযুহাতে সে নরসিংদী থেকে যায়। 
একপর্যায়ে আবারও গত ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মাহমুদা বেগমকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।

এর আগে তাঁকে ঘিরে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ‘ঝাড়ু মিছিলের’ ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার বদলির আদেশ হলেও বিভিন্ন কারণে সেসব আদেশ বাতিল বা কার্যকর হয়নি। এবারের আদেশ নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন

প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও অন্যান্য জটিলতা তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন করা হলেও এসব কমিটির কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এ সুযোগে মাহমুদা বেগম নিজ উদ্যোগে একটি লিখিত প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কাছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রতিবেদনে অতীতের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের আপত্তির কারণে প্রতিবেদনটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

স্থাপনার ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভুক্তভোগীদের কয়েকজনও মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আব্দুর রউফ গাজী, মানিক গাজী, সামসুল আলম খান ও হারুন রশীদ খানের দাবি, তাঁরা জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেলেও স্থাপনার ক্ষতিপূরণের অর্থ এখনো পাননি।

তাঁদের অভিযোগ, ‘‘আমরা জমির বিল পেয়েছি। কিন্তু এখনো স্থাপনার বিল পাইনি। হাইকোর্টের আদেশ থাকার পরও নানা অজুহাতে বিল দেওয়া হয়নি। এতে আমরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’’

তাঁদের আরও অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি তৎপর ছিলেন। 

এ ছাড়া মাহমুদা বেগম ও সাবেক জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন রিংকুর স্ত্রীকে ঘিরে স্বর্ণের দোকান থেকে পণ্য নেওয়ার পর মূল্য পরিশোধ না করা এবং অধীনস্থ কর্মচারীদের মাধ্যমে কুরিয়ার বিল পরিশোধের অভিযোগও উঠেছে।

বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ডিজিএফআই, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার কথা জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিগত সরকারের আমলে দুর্দান্ত প্রতাপশালী ছিলেন এই মাহমুদা বেগম। ইতোপূর্বে তিনি যেসকল স্টেশনে কাজ করেছেন সেখানেই তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন।  সাংবাদিকরা পর্যন্ত তার হাত থেকে রেহাই পায়নি। এই সরকারের শুরুতেই তিনি নরসিংদীতে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের কাজ বন্ধ করে ঘাপলা বাধিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরী করেছেন। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করেন সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা। 
আওয়ামী মদদপুষ্ট এই কর্মকর্তার নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নরসিংদী থেকে সরানোর জন্য স্থানীয় সরকার দলীয় এক সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

মাহমুদা বেগমের বক্তব্য: 

অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন। তবে কেন তার বিরুদ্ধে এত গুলো অভিযোগ ও আন্দোলন হলো এমনকি তার দপ্তরের অধিনন্ত কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন এ বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি। 

সমন্বয় সভায় নজর

এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জরুরি সভাকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সভায় ভূমি অধিগ্রহণের আটটি মামলা, ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের নরসিংদী অংশের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে কার্যকর সিদ্ধান্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নির্মাণকাজে গতি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অতীতে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সরকারি নথির ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর