তীব্র লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরার জনজীবন। গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরের শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, ঘন ঘন আসা-যাওয়া এবং ভোল্টেজের ওঠানামায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। কোথাও যন্ত্রপাতি চালানো যাচ্ছে না, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জেলায় তাদের গ্রাহক প্রায় সাড়ে ৬ লাখ। পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৫৮ মেগাওয়াট এবং স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ১২০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ বা তারও বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় দিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি তোলার পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় কোথাও কোথাও পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
বিসিক শিল্পনগরীতে উৎপাদনে ধস
বিদ্যুৎ সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার বিনেরপোতা বিসিক শিল্পনগরীতে। বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক গৌরব কুমার দাশ জানান, শিল্পনগরীতে মোট ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে ৩০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। তবে অব্যাহত লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মেসার্স সঞ্জয় আইস প্লান্টের মালিক সঞ্জয় কুমার বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজের কারণে নিয়মিত বরফ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিনেরপোতা মৎস্য আড়তসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের কারখানা থেকে বরফ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো চাহিদা অনুযায়ী বরফ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন দীপা আইস প্লান্টের মালিক। হিমায়িত মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় বরফ সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিনেরপোতা বিসিক শিল্পনগরীর রানি ফ্লাইউডের উৎপাদনও বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ সময় শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন না হলেও শ্রমিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে।
বরফ সংকটে মৎস্য ব্যবসা
সাতক্ষীরার মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে বরফ উৎপাদন সরাসরি সম্পৃক্ত। বরফের সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণেও প্রভাব পড়ছে।
কালিগঞ্জ বাজারের বড় একটি বরফ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুল আজিজ বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বরফ উৎপাদন ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে নিয়মিত ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পোল্ট্রি শিল্পেও বাড়ছে শঙ্কা
বিদ্যুৎ সংকটে জেলার পোল্ট্রি শিল্পও ঝুঁকিতে পড়েছে। পাটকেলঘাটার বাইগুনিতে অবস্থিত একটি পোল্ট্রি হ্যাচারির মালিক আব্দুল মোমিন জানান, দীর্ঘ লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের বৈদ্যুতিক মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাটকেলঘাটার খলিশখালি ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামের পোল্ট্রি ফিড ব্যবসায়ী ও হ্যাচারি মালিক রুহুল আমিন বলেন, তার নিয়ন্ত্রণাধীন শতাধিক পোল্ট্রি খামার বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অতিরিক্ত গরমে মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো খামারে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য ব্যবসা
আশাশুনিসহ মৎস্যপ্রধান এলাকায় বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ধানের মিল, মুড়ির মিল, খাবার পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চালকেরাও সময়মতো ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় আয় হারাচ্ছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া এবং হাই-লো ভোল্টেজের কারণে ফ্রিজ, মোটরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পড়াশোনায়ও ব্যাঘাত
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। সামনে পরীক্ষা থাকলেও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে পড়াশোনা করতে পারছে না তারা। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার গণমাধ্যমকর্মী মাসুম বিল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া ও ভোল্টেজের ওঠানামায় মূল্যবান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকটকে দায়ী করছে বিদ্যুৎ বিভাগ
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) মুহাঃ আজিজু রহমান সরকার বলেন, দেশজুড়ে চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ওঠানামা করছে।
তিনি জানান, সাধারণত এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর পরবর্তী এক ঘণ্টা লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বেশি সময় কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলে তা কারিগরি ত্রুটি বা স্থানীয় সমস্যার কারণে হতে পারে।
তবে শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাতক্ষীরায় লোডশেডিং হয়নি এবং চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাতক্ষীরার অর্থনীতির বড় অংশ মৎস্য, পোল্ট্রি, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাত বিদ্যুতের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়ায় সংকট দীর্ঘায়িত হলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি শ্রমিক ও ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়ানো, লোডশেডিংয়ের সুশৃঙ্খল সময়সূচি নিশ্চিত করা এবং লো-ভোল্টেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।