মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘি ইউনিয়নের স্বল্প হাতকোড়া গ্রামের প্রায় ৩০ পরিবারের তিন বছরের চলাচলের দুর্ভোগ অবসানের পথে। ‘রাস্তা বন্ধে অবরুদ্ধ এক পাড়ার ৩০ পরিবার’ শিরোনামে দৈনিক নিখাদ খবরে প্রতিবেদন প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিরোধপূর্ণ জমি পরিমাপ করে রাস্তার জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার দখলমুক্ত করে নির্ধারিত জায়গায় রাস্তা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে জমি পরিমাপ ও সীমানা নির্ধারণের কাজ তদারকি করেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিক্তা খাতুন। এ সময় ছিদাম সরকারের পক্ষে চারজন সার্ভেয়ার এবং শ্রীরাম সাধু আশ্রম কমিটির পক্ষে একজন সার্ভেয়ার উপস্থিত ছিলেন।
উভয় পক্ষের জমির কাগজপত্র পর্যালোচনা ও সরেজমিনে পরিমাপ শেষে সরকারি আমিন বিরোধপূর্ণ জায়গার সীমানা চিহ্নিত করেন। প্রশাসনের নির্ধারণ করা সীমানা উভয় পক্ষ মেনে নেয়। পরে দখলে থাকা জমি সরিয়ে আগামী শুক্রবার সকালে রাস্তা নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের এ উদ্যোগে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আশায় বুক বেঁধেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের তৎপরতা
গত ৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক নিখাদ খবরে ‘রাস্তা বন্ধে অবরুদ্ধ এক পাড়ার ৩০ পরিবার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর ওই দিন বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ইউএনও মৌসুমী নাসরিন।
পরে তিনি শ্রীরাম সাধু আশ্রম কমিটি ও ছিদাম সরকারকে জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলা পরিষদে উপস্থিত হওয়ার জন্য নোটিশ দেন। উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বিরোধপূর্ণ জায়গা সরকারি আমিন দিয়ে পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে জমি পরিমাপ করে রাস্তার জন্য নির্ধারিত জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়।
তিন বছর ধরে বন্ধ ছিল রাস্তা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ছিদাম সরকার, তাঁর ছেলে সুদেব সরকার ও মেয়ে দুলমতি রাস্তার একটি অংশ বন্ধ করে দেন। শ্রীরাম সাধু আশ্রমের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে যাওয়া প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ রাস্তাটি মাটি ফেলে উঁচু করা হয়। সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি ছাপড়া ঘরও।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আশ্রমের পেছনে বসবাসকারী পরিবারগুলোর চলাচলের প্রধান পথ ছিল এটি। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
৯৬ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ভজন চন্দ্র দে জানিয়েছিলেন, প্রায় ৬০ বছর ধরে তিনি ওই রাস্তা ব্যবহার করেছেন। রাস্তা বন্ধ হওয়ার পর বয়সের কারণে হাঁটতে কষ্ট হলেও বাধ্য হয়ে ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে তাঁকে।
একাধিক সালিসেও মেলেনি সমাধান
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাস্তা বন্ধের পর বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে ৮ থেকে ১০ বার সালিস হয়েছে। জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো উদ্যোগেই স্থায়ী সমাধান হয়নি।
রাস্তা বন্ধের অভিযোগের বিষয়ে ছিদাম সরকারের পরিবারের পক্ষ থেকে জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলা হয়। ছিদাম সরকারের স্ত্রী ছানি বালা দাবি করেছিলেন, কাগজপত্র অনুযায়ী বিরোধপূর্ণ জায়গার ২৪ শতাংশ জমি তাঁদের মালিকানাধীন। জমি পরিমাপের সময় অতিরিক্ত জমি ছেড়ে দিতে বলা হলেও তাঁরা নিজেদের জমি ছাড়তে রাজি নন বলে জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আশ্রম কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ছিল, আশ্রমের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময় রাস্তার জন্য জায়গা রেখে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ওই পথ দিয়ে স্থানীয়রা চলাচল করে আসছেন বলেও দাবি তাঁদের।
মঙ্গলবার প্রশাসনের উদ্যোগে জমি পরিমাপ ও সীমানা নির্ধারণের পর উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ায় দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসানের পথ তৈরি হয়েছে। এখন শুক্রবার নির্ধারিত জায়গা দখলমুক্ত করে রাস্তা নির্মাণ করা হলে প্রায় ৩০ পরিবারের তিন বছরের চলাচলের দুর্ভোগ পুরোপুরি দূর হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।