শিরোনাম

৭ বছর ধরে প্রস্তুত হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা মিলছে শুধু বহির্বিভাগে

৭ বছর ধরে প্রস্তুত হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা মিলছে শুধু বহির্বিভাগে

নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় সাত বছর আগে। ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আধুনিক ভবন, অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, কেবিন, ল্যাব ও অক্সিজেন প্লান্টসহ চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও প্রস্তুত। কিন্তু চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি রংপুরের ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল।

গত ১ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব এক থেকে দুই মাসের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম আসেনি, হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন। অগ্রগতি হিসেবে সম্প্রতি এসেছে তিন গাড়ি আসবাবপত্র।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে হাসপাতালের অধিকাংশ কক্ষ। সীমিত পরিসরে শুধু বহির্বিভাগের চিকিৎসা চলছে। পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু না হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল।

৩১ কোটি টাকার অবকাঠামো

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের এক একর ৭৮ শতাংশ জমিতে উত্তরবঙ্গের প্রথম সরকারি ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।

দুই বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় আড়াই মাস আগেই ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের ৮ মার্চ হাসপাতাল ভবনটি সিভিল সার্জনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তবে করোনা মহামারির কারণে হাসপাতালটির মূল কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে সেখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবল সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পরও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি।

৬৫৯ জনবলের প্রস্তাব

হাসপাতাল পরিচালনার জন্য ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব করে ২০২৩ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। হাসপাতাল পরিচালনায় বছরে প্রায় ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন হয়নি।

২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের নিচতলার তিনটি কক্ষে অস্থায়ীভাবে বহির্বিভাগ চালু করা হয়। সেখানে শুধু টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ রয়েছে; রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।

দুই মাসের আশ্বাস, বাস্তবে শুধু আসবাবপত্র

গত ১ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার অতিরিক্ত সচিব আরিফ আহমদ হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে রংপুরসহ দেশের নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং জনবল নিয়োগের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও জানিয়েছিলেন, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং আগস্টের মধ্যেই হাসপাতালে যন্ত্রপাতি পৌঁছাবে। পদ সৃষ্টির বিষয়টি অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

কিন্তু সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর শুরু হলেও হাসপাতালে পৌঁছায়নি চিকিৎসা সরঞ্জাম। হয়নি চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নও। এর মধ্যে সম্প্রতি তিন গাড়ি আসবাবপত্র হাসপাতালে ঢুকেছে।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, “সম্প্রতি তিন গাড়ি আসবাবপত্র হাসপাতালে ঢুকেছে। আসবাবপত্র ঢোকানো শেষ হলে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি কবে আসবে এবং কবে হাসপাতাল চালু হবে, তা জানা নেই।”

অবকাঠামো প্রস্তুত, পড়ে আছে কক্ষ

তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতিটি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। প্রথম তলায় জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের চেম্বার ও ল্যাব; দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার ও ব্রোন ইউনিট এবং তৃতীয় তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া রয়েছে সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার, ডক্টরস কোয়ার্টার, স্টাফ ও নার্স কোয়ার্টার, গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার এবং বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ভবন। আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও অধিকাংশ কক্ষ বর্তমানে অব্যবহৃত।

হাসপাতালে বর্তমানে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও চারজন কনসালট্যান্ট প্রেষণে সংযুক্ত রয়েছেন। প্রতিদিন একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও একজন কনসালট্যান্ট সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। তবে অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় শিশুদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই।

রমেকে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ

রংপুর শিশু হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় বিভাগের শিশু রোগীদের বড় একটি অংশের চিকিৎসার চাপ পড়ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর।

রমেকে শিশুদের জন্য ১০৮টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ শিশু ভর্তি থাকে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

নগরীর কেরানীপাড়ার বাসিন্দা জোসনা বেগম বলেন, এ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের চিকিৎসার বড় ভরসা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে সবসময় রোগীর চাপ থাকায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে স্বল্প খরচে শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হতো।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রোগীর চাপে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শয্যার তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। শিশু ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। শিশুদের সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।

তিনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করে দ্রুত হাসপাতালের অন্তর্বিভাগের কার্যক্রম চালুর দাবি জানান।

আপনার মতামত লিখুন
সর্বশেষ সব খবর
জনপ্রিয় সব খবর