সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, হাসপাতালে হামলার ঘটনায় দায় নির্ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগ তদন্তসহ চার দফা পদক্ষেপ দাবি করেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দেওয়া, পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ওপর আবারও হামলা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যার ঘটনা আইনের শাসন ও নাগরিকের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত। কোনো অভিযোগের বিচার করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই; এ দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনানুগ বিচারব্যবস্থার।
এনসিপি জানায়, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর শামীমের ওপর হামলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কারী ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে। তাঁকে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদল কর্মী সাদিকুল ইসলাম এবং সরকারি খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজমুলের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে দলটি।
পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরও তাঁর নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাসপাতাল যদি একজন আহত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। শত শত মানুষের ভিড়ে কীভাবে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলার সুযোগ সৃষ্টি হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার জবাব দিতে হবে। শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখতে হবে।
দলটি আরও বলেছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ গুরুতর হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই শাস্তি দেওয়ার নামে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার নামে আইন ভাঙা বা বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
এনসিপির বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা এবং মানুষের জীবন ও আইনি অধিকার রক্ষা—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করার অধিকার কারও নেই। দলটির মতে, সব মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও অংশ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নিহত শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁর চিকিৎসা চলছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা, বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অডিও বা অভিযোগকে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেওয়ার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বৈধ নয়।
এনসিপির চার দফা দাবি
১. হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার: প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে দলটি। হামলায় উসকানি দেওয়া, জনতাকে সংগঠিত করা কিংবা সহিংসতা সংঘটনে ভূমিকা রাখার অভিযোগও তদন্ত করতে হবে।
২. হাসপাতালে দ্বিতীয় দফা হামলার জবাবদিহি: চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর হামলা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অবহেলা বা যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজবের তদন্ত: উত্তেজনা ছড়ানোর কারণ হিসেবে আলোচনায় আসা অডিওর উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে। বক্তব্য প্রচার, জনতাকে জড়ো করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক উসকানি ও প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে সহিংসতা ছড়ানো ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে দলটি।
৪. পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: নিহতের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যাতে ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই বক্তব্য দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি।